উপকূল বরাবর অগ্রসর হচ্ছে হুথি বাহিনী, সৌদির তেল রপ্তানিতে নতুন হুমকি

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়েছে বলে সামরিক সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরা...

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়েছে বলে সামরিক সূত্র জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে বলে মন্তব্য করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হুথিদের এই অগ্রগতির খবর সামনে আসে।

মোখা দখল, হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর

ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলোর দাবি, হুথিরা মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়েছে। তারা কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছেছে।

ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রের ভাষ্য, এর মাধ্যমে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর ওপর হুথিদের প্রভাব আরও বেড়েছে।

বাব আল-মান্দাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। লোহিত সাগরের সঙ্গে এ প্রণালি এডেন উপসাগর ও পরবর্তী সময়ে ভারত মহাসাগরের যোগাযোগ তৈরি করে।

বাব আল-মান্দাব নিয়ন্ত্রণে এলে কী হবে?

হুথিরা যদি বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে তা ইরানের জন্য বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরব উপদ্বীপের অন্য পাশে অবস্থিত হরমুজ প্রণালীর মতো বাব আল-মান্দাবও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যেত।

হরমুজ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের পথের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। ফলে বাব আল-মান্দাবেও বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে সৌদি তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নতুন সংকটে পড়তে পারে।

এতে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ট্রাম্প যে পথ খুঁজছেন, সেটিও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব রিপাবলিকান পার্টির জন্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্যদের জন্য নিরাপদ?

হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লোহিত সাগরে সব নৌযানের চলাচল নিরাপদ। তবে সৌদি আরবের জাহাজগুলো এর বাইরে থাকবে বলে তারা জানিয়েছে।

অর্থাৎ সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা বা হামলার হুমকি অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে হুথিরা।

সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ। ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি তেল পরিবহনে লোহিত সাগরের পথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

বাব আল-মান্দাবের দিকে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অগ্রসরতা

হুথিদের অগ্রগতির মধ্যে ইয়েমেন সরকারের সামরিক বাহিনী ও তাদের মিত্ররাও লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে সরে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে ধুবাবের দিকে যাচ্ছে বলে সরকারি সামরিক সূত্র জানিয়েছে।

ধুবাবের অবস্থান বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে এবং এর বিপরীতে রয়েছে পেরিম দ্বীপ।

সরকারি বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ধুবাব ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ।

তিনি বলেন, ইয়েমেনের যুদ্ধে এখন ‘আরও নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়’ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ার ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের প্রবেশপথে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানান জাতিসংঘের বিশেষ দূত।

হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট’ বলল যুক্তরাষ্ট্র

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

তিনি বলেন, হুথিদের এই উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এই কর্মকাণ্ডকে সক্ষম করে তুলছে, তাদের এর পরিণতির দায় বহন করতে হবে।

ইরানের বক্তব্য

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, হুথিদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা সামরিক অভিযান চালিয়ে ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধান করা সম্ভব নয়।

তেহরান এই সংকট সমাধানে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিবৃতিতে ইয়েমেনের হুথিদের কর্মকাণ্ডে ইরানের নিজেদের ভূমিকার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

এদিকে ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তা, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের উপকূল ধরে হুথিদের অগ্রগতির পেছনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির সরাসরি নির্দেশনা ছিল।

তবে হুথি মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম এসব অভিযোগ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি। তিনি বলেছেন, তাদের অভিযান প্রতিরক্ষামূলক এবং ইয়েমেনের ওপর হামলা বন্ধ হলে এসব অভিযানও বন্ধ হয়ে যাবে।

তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ল

হুথিদের অগ্রগতির খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে।

বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দাম প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি।

সৌদির বিরুদ্ধে হুথিদের অবরোধ

মার্চে ইসরায়েলে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার পর জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। চলতি মাসে তারা হামলা আরও জোরদার করেছে।

এর ফলে সৌদি আরব ও আশপাশের অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে।

হুথিদের হামলার মধ্যে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চতুর্থবারের মতো সেখানে এ ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়।

ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান পাকিস্তানের

সংকট আরও বড় আকার নেওয়া ঠেকাতে পাকিস্তান ইরানের কাছে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র জানিয়েছে।

পাকিস্তান সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইরানকে এই সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

তবে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এর জবাবে বলেছেন, ‘ইরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’

উপসাগরীয় নৌপথে বড় সংঘাতের আশঙ্কা

ইয়েমেন উপকূলে হুথিদের এই অগ্রগতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথে পাল্টাপাল্টি হামলার সবচেয়ে বড় ঢেউ চলছে।

হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের নৌপথও এখন সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানের যুদ্ধ তহবিলে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

এদিকে হুথিদের অগ্রগতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ।

হিজবুল্লাহ ও ইরানের অন্যান্য প্রক্সিকে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর লক্ষ্য ইরানের যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস বন্ধ করা।

সব মিলিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। মোখা ও কৌশলগত দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালীর ওপর প্রভাব বাড়াতে পারলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য পর্যন্ত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধি ও নৌপথের নিরাপত্তা সংকট নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

এমএসএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/international/news/1155983
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World