হাঁটা শেখার আগেই দৌড়ের পরীক্ষায় মক্কা চুক্তি!
ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই আলোচনায় এসেছে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত ৭ আগস্ট মক্কায় তারা এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপরই হামলা বলে বিবেচনা করা হবে।
তবে চুক্তি সইয়ের এক মাস না পেরোতেই সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত সেটির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সৌদি-হুথি সংঘাতের নতুন উত্তাপ
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এর পাল্টা জবাবে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে বিমান হামলা বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হুথি হামলায় সৌদি আরবে ৭৩ জন আহত হন। এরপর সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে হামলা আরও জোরদার করে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো লোহিত সাগর। হুথিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। মোখা বন্দর দখলের পর তারা কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির আরও কাছে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মক্কা চুক্তি কী বলছে
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। চুক্তির মূল কথা হলো সমষ্টিগত প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা। কোনো একটি সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। এটি প্রতিরক্ষামূলক এবং এর লক্ষ্য সদস্যদেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষা করা।
চুক্তির বাস্তব কাঠামোও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক হয়। সেখানে যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
হুথিদের জন্য পাকিস্তানের হুঁশিয়ারি
সৌদি আরবে হুথিদের হামলা বাড়ার পর পাকিস্তান কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। ইসলামাবাদ ইরানকে হুথিদের হামলা নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা চলতে থাকলে মক্কা চুক্তির বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
তিনি বলেন, ইয়েমেনের সংঘাত যদি সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়ে কিংবা কোনো ধরনের উসকানিবিহীন হামলা হয়, তাহলে চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—পাকিস্তান কি এবার সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়াবে?
চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান কি যুদ্ধে যাবে?
এখানেই রয়েছে মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
চুক্তিতে ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’ বলা হলেও এর অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইয়েমেনে পাকিস্তানি সেনা পাঠানো—এমনটি স্পষ্ট নয়। বরং পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিষয়টি আরও সতর্কভাবে দেখা হচ্ছে।
১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, হুথিদের হামলার পর মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি।
তিনি বলেছেন, পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনায় নেই।
অর্থাৎ রাজনৈতিক বার্তা কঠোর হলেও সামরিক পদক্ষেপের প্রশ্নে ইসলামাবাদ এখনো সংযত।
সংঘাতে না জড়ানোর ফাঁক কোথায়
মক্কা চুক্তির ভাষা এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখানেই বড় একটি জায়গা তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক।
দ্বিতীয়ত, কোন পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তার বাস্তব প্রয়োগের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, সৌদি ভূখণ্ডে হামলার জবাব দিতে গিয়ে ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি সামরিক অভিযান চালাবে কি না, সেটিও আলাদা প্রশ্ন।
চতুর্থত, পাকিস্তান একই সময়ে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মক্কা চুক্তির কার্যকর কাঠামো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চুক্তির লক্ষ্য হিসেবে তারা শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রতিরোধ ও সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথাও বলছে।
তুরস্কের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
মক্কা চুক্তির তৃতীয় অংশীদার তুরস্ক।
চুক্তি সইয়ের পর তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এটি কোনো দেশকে সাধারণ শত্রু বা প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করছে না। চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং যৌথ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো।
ফলে সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে তুরস্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিও ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে ইয়েমেনের ভেতরে অভিযান এবং সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের কঠিন চ্যালেঞ্জ
হুথিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ালে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে। হুথিদের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়। ফলে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় মিত্র বাহিনীর সেনা বা বিমান ইয়েমেনে অভিযান চালালে সেটি শুধু হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ থাকবে না, তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধেও অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর, কারণ ইরান তার সরাসরি প্রতিবেশী। সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখতে চায়। ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামলে সীমান্তনিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে পাকিস্তান যদি সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সীমিত সহায়তা দেয় এবং ইয়েমেনে সরাসরি হামলা এড়িয়ে চলে, তাহলে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ মক্কা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামনে একটি সূক্ষ্ম পথ রয়েছে—সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষা করা, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে রূপ না দেওয়া। এ কারণেই হুথি সংকট শুধু মক্কা চুক্তির নয়, পাকিস্তান-ইরান সম্পর্কেরও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
হাঁটা শেখার আগেই দৌড়ের পরীক্ষা!
মক্কা চুক্তির বয়স মাত্র এক মাসের কিছু বেশি। এর মধ্যেই এমন একটি সংকট সামনে এসেছে, যা চুক্তির বাস্তব সক্ষমতার পরীক্ষা নিচ্ছে।
চুক্তির কাঠামো পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ার আগেই যদি সৌদি আরব বড় ধরনের আক্রমণের মুখে পড়ে, তখন তিন দেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা বলতে তারা ঠিক কী বোঝে।
শুধু গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সহায়তা? নাকি সৌদি আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সরাসরি সামরিক উপস্থিতি? নাকি প্রয়োজনে ইয়েমেনের ভেতরেও অভিযান?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী?
চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে সৌদি-হুথি সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয় তার ওপর। সংঘাত যদি সৌদি ভূখণ্ডে সীমিত হামলার পর্যায়ে থাকে, তাহলে মক্কা চুক্তি সম্ভবত প্রতিরোধমূলক রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়ের কাঠামো হিসেবেই এগোবে।
কিন্তু হামলা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা বন্দরগুলো নিয়মিত আক্রান্ত হয়, তখন চুক্তির ওপর সামরিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ বাড়বে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাব আল-মান্দাব। এই প্রণালির নিরাপত্তা নষ্ট হলে বিষয়টি আর শুধু সৌদি-হুথি সংঘাতের মধ্যে থাকবে না। আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ফলে, মক্কা চুক্তি শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকর যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো হবে, নাকি মূলত রাজনৈতিক প্রতিরোধের জোট হিসেবে থাকবে—তার উত্তর হয়তো ইয়েমেনের যুদ্ধই প্রথম দেবে।
সূত্র: রয়টার্স ১ ও ২, সিএনএন, পাকিস্তান সরকার
কেএএ/











