হুথির দখলে ইয়েমেনের মোখা বন্দর, বাব আল-মান্দেবও কব্জার পথে
ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দখল নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা।
মোখা দখলের পর অঞ্চলটিতে নতুন করে বড় ধরনের মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে শত শত নারী ও শিশু শহরটি ছেড়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত লাহিজ ও এডেন প্রদেশের দিকে আশ্রয়ের জন্য চলে গেছে।
গত দুই সপ্তাহে তাইজ ও আল-হুদায়দা প্রদেশে সংঘর্ষের কারণে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মোখা দখলের পর এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যেভাবে মোখার নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা
মোখা দখল হুথিদের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ফল। গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিক দিয়ে সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করে হুথিরা। তাদের অভিযান চলে পশ্চিম তাইজ, দক্ষিণ আল-হুদায়দা ও মোখা শহরকে কেন্দ্র করে।
মোখার উপকণ্ঠে তীব্র লড়াই হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আল জাজিরার ইয়েমেনবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেন, ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ার পর হুথিরা মোখা নিয়ন্ত্রণে নেয়।
এই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ। তিনি ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা। আলি আবদুল্লাহ সালেহ প্রথম দিকে হুথিদের সঙ্গে জোট করলেও পরে তাদের বিরোধিতা করেন। ২০১৭ সালে হুথিদের হাতে তিনি নিহত হন।
মোখা থেকে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস সরে যাওয়ার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তারা নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের জন্য সরে গেছে, নাকি তীব্র হুথি আক্রমণ মোকাবিলা করতে না পেরে পিছু হটেছে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক সালেহ বাহিনীকে কৌশলগতভাবে পিছু হটে নতুন অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিকল্প কমান্ড সেন্টার স্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রেও
মোখা দখলের পাশাপাশি ইয়েমেনের সংঘাত এখন স্থলভাগের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত চারটি সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর সামরিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, আল-হুদায়দা প্রদেশের আল-তুহাইতা, আল-সালিফ ও কামারান দ্বীপে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
এর জবাবে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জুকার দ্বীপের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে জানা গেছে।
ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। মারিবে সানা থেকে আসা হুথি বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব নিয়ে কেন এত উদ্বেগ
মোখার অবস্থানই এই শহর দখলকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। শহরটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনে এই পথ গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদির জ্বালানি স্থাপনায় হুথিদের হামলা
এ ছাড়া এশিয়ার পণ্য এবং রাশিয়ার তেল পরিবহনেও এই নৌপথের ভূমিকা রয়েছে। আল জাজিরার ইউসুফ মাওরি বলেন, মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের বাব আল-মান্দেবের ওপর শক্ত চাপ তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে।
মোখা দখলের ফলে হুথিবিরোধী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে মোখা ও তাইজের সংযোগ সড়ক এবং মোখা বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত সরবরাহব্যবস্থা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই বলেন, মোখা দখল ইয়েমেন যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর অবস্থান ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরও ছিল মোখা।

হুথির ভয়ে দিক পাল্টাল সৌদি আরবের ৬ জাহাজ
আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ
মোখা দখলের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র এ সংকটের জন্য হুথিদের দায়ী করেছেন। তিনি হুথিদের অবিলম্বে হামলা ও উত্তেজনা বাড়ানোর কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মোখার নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের গতিপথকেই প্রভাবিত করতে পারে না। এর প্রভাব পড়তে পারে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজেও।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/

