৮৮ বছরে কৃষিশিক্ষার বাতিঘর
রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে কৃষিশিক্ষার এক দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৩৮ সালে যে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল কৃষিবিদ তৈরির স্বপ্ন নিয়ে, সময়ের স্রোতে নানা নাম ও পরিচয় পেরিয়ে সেটিই আজকের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। উপমহাদেশের কৃষিশিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২৫ বছর পূর্ণ করলেও কৃষিশিক্ষা ও গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটির পথচলা প্রায় ৮৮ বছরের। এই দীর্ঘ সময়ে হাজারো কৃষিবিদ তৈরির পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দেশের কৃষি উন্নয়নে রেখে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
কৃষির আধুনিকায়নের স্বপ্নে যে যাত্রা
অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষিকে আধুনিকায়ন এবং তৎকালীন বাংলার খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার লক্ষ্যে ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিশিক্ষার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ১০ জন মুসলিম ও ১০ জন হিন্দু শিক্ষার্থীকে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়। চার বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করে ওই ২০ শিক্ষার্থী উপমহাদেশের প্রথম কৃষিবিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

দেশভাগের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নামও পরিবর্তিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট রাখা হয়। পরে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বিএআই)।
বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দীর্ঘ অপেক্ষা
দেশের কৃষিখাতকে এগিয়ে নিতে বিএআই থেকে হাজার হাজার কৃষিবিদ তৈরি হলেও দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়নি। একপর্যায়ে ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটকে এর অধিভুক্ত করা হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব উচ্চশিক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০১ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটের হীরকজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ সেপ্টেম্বর সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ আইন কার্যকর হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৬৩ বছরের কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নতুন পরিচয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
২৫ বছরে বিস্তৃত শিক্ষা ও গবেষণার পরিসর
বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার ২৫ বছরে শেকৃবির একাডেমিক কার্যক্রম ও পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার শুরুর তুলনায় বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
কৃষি, কৃষি অর্থনীতি, এনিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং ফিশারিজসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। একই সঙ্গে স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম।

শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধার জন্য রয়েছে একাধিক আবাসিক হল। রয়েছে আধুনিক গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, কেন্দ্রীয় গবেষণা মাঠসহ বিভিন্ন একাডেমিক ও গবেষণা অবকাঠামো। শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজও চলমান রয়েছে।
গবেষণার মাঠে শেকৃবির ছাপ
কৃষিশিক্ষার পাশাপাশি গবেষণাতেও শেকৃবির রয়েছে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষকের সমস্যা সমাধান এবং নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন।

শেকৃবিতে ৮০ বিসিএস ক্যাডারকে সংবর্ধনা
শেকৃবির গবেষকদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন উচ্চফলনশীল ধানের জাত দেশের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে সাউ স্মার্ট ড্রায়ার, স্মার্ট ফিডার ও স্মার্ট এরেটর। একই গাছে আলু ও টমেটো উৎপাদনের জাত ‘পমেটো’, ভিনদেশি সবজি ব্রাসেলস স্প্রাউট, সলুক, উন্নত পানের জাত নির্বাচন এবং প্রাণিদেহে অণুজীবঘটিত রোগ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাও শেকৃবির গবেষণাকর্মের উল্লেখযোগ্য অংশ।
কৃতী কৃষিবিদ তৈরির দীর্ঘ ঐতিহ্য
শেকৃবির ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের অনেক কৃতী কৃষিবিদ ও বিজ্ঞানীর নাম। ‘কাজী পেয়ারা’র জনক ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এ প্রতিষ্ঠানেরই সাবেক শিক্ষার্থী। কৃষিবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এবং ড. এস এম জামান বাংলাদেশ সরকারের ‘সায়েন্টিস্ট ইমেরিটাস’ পদে ভূষিত হন।

কৃষিশিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানের কৃষিবিদ ও গবেষকরা স্বাধীনতা পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক ও শেরেবাংলা পদকসহ বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননা অর্জন করেছেন।
গবেষণাগার থেকে কৃষকের মাঠে
শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা নয়, কৃষকের বাস্তব সমস্যা সমাধানেও শেকৃবির গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, কৃষিপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদের উন্নয়নসহ কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকদের পাশাপাশি এখানকার গ্র্যাজুয়েটরাও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষি সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে কাজ করছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অর্জনের পাশে বড় হচ্ছে চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ পথচলায় অর্জনের পাশাপাশি শেকৃবিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নানা চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, পরিবহনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ওপর বাড়ছে চাপ। একই সঙ্গে আধুনিক গবেষণার জন্য উন্নত ল্যাবরেটরি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বাকৃবিতে মুরগির নতুন জাত উদ্ভাবন
ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিশিক্ষা নিশ্চিত করাও এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ। খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও স্মার্ট কৃষির মতো পরিবর্তিত বাস্তবতায় শেকৃবির গবেষণাকে আরও কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বমানের স্বপ্ন
বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট থেকে ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট, এরপর বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট এবং সবশেষে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়—নানা নাম ও পরিচয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় ৮৮ বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এলেও কৃষিশিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রাখার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি শেকৃবি।

বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২৫ বছর পূর্ণ করা শেকৃবি এখন ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর একটি প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাস। অতীতের গৌরবকে ধারণ করে আধুনিক কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দিনে কৃষির নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উদ্ভাবনী গবেষণা এবং দক্ষ কৃষিবিদ তৈরির মাধ্যমে দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় আরও বড় ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ২৫ বছরের ঐতিহ্য এবং দুই বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে শেকৃবিকে আরও স্বচ্ছ, গবেষণামুখী ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষক-জনবল, আবাসন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষার্থীসেবার মান আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে শেকৃবিকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের প্রধান প্রত্যাশা।
বিএ


