এসএসসির খাতা মূল্যায়নে গাফিলতি, ফল তৈরিতে ‘জালিয়াতি’
- ফল পরিবর্তনে রেকর্ড, নেপথ্যে মূল্যায়নে গাফিলতি
- চট্টগ্রাম বোর্ডে একের পর এক ফলাফল ‘জালিয়াতি’
- সন্দেহের তীর প্রোগ্রামার-সিস্টেম এনালিস্টদের দিকে
- মধ্যরাতে শিক্ষক ডেকে ফল বাড়ানোর অভিযোগ
- জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঘোষণা শিক্ষা বোর্ডের
এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার উত্তরপত্র বা খাতা মূল্যায়ন থেকে শুরু করে ফল তৈরির প্রক্রিয়ায় একের পর এক অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠছে।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফল নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। এ পুনর্নিরীক্ষণে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। আর ফেল থেকে পাস করেছে ৪ হাজার ৫৮৫ জন।
শুধু তা-ই নয়, পুনর্নিরীক্ষণে ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের খাতার নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। জিপিএ বা গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের। এর মধ্যেই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফল তৈরিতে নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। একজন শিক্ষার্থী মাত্র এক বিষয়ে পাস করে জিপিএ-৪.৯৪ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও বোর্ডের দাবি, ওই শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। পরে তার ফল স্থগিত করা হয়েছে।
পাশাপাশি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে মধ্যরাতে শিক্ষকদের ডেকে খাতা মূল্যায়ন ও ফল বাড়িয়ে দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র বা খাতা মূল্যায়ন ও ফল তৈরির পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যায়নের এমন অসঙ্গতি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থার সংকট তৈরি করছে। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা দর্শন ঠিক না করে বিক্ষিপ্তভাবে ব্যবস্থা পরিচালনা করলে এমন ঘটনা আরও ঘটবে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে একের পর এক ‘জালিয়াতি’
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, গত ২৫ আগস্ট পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রমের সময় একজন পরীক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের একটি উত্তরপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখতে পান, খাতায় প্রাপ্ত নম্বর শূন্য। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে ওই খাতায় ৪৫ নম্বর দেখানো হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হলে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মান্নান কম্পিউটার সেন্টারের ডাটার সঙ্গে উত্তরপত্রের নম্বর মিলিয়ে দেখেন। সেখানেও অমিল পাওয়া যায়।
এসএসসি ও এইচএসসির ফল তৈরির প্রক্রিয়ায় ওএমআর শিট স্ক্যানিং এবং নম্বর এন্ট্রির পর তা লক হয়ে যায়। বোর্ডের অত্যন্ত সুরক্ষিত সার্ভারে প্রবেশ করে নম্বর পরিবর্তন করা আইটি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা
অভিযোগ ওঠা বিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষার্থী প্রকাশিত ফলে জিপিএ-৪.৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনি পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য বোর্ডে আবেদন করেছিলেন। পুনর্নিরীক্ষণে তিন বিষয়ের নম্বরে অমিল ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর অন্য উত্তরপত্রগুলোও তলব করা হয়। তদন্তে সেগুলোতেও নম্বরের অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
বোর্ড সূত্র জানায়, প্রকাশিত ফলাফলে বাংলায় (দুই পত্রে ২০০ নম্বর) ‘এ মাইনাস’ পেয়ে ১২০, রসায়নে ‘এ’ পেয়ে ৭৮ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে ‘এ’ পেয়ে ৩৭ নম্বর দেখানো হয়। অন্য অধিকাংশ বিষয়ে ছিল ‘এ প্লাস’।
শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের দাবি, তারা প্রকাশিত ফলকে চ্যালেঞ্জ করে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেননি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রেকর্ড থেকে জালিয়াতি চক্র বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছিল। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয়।
যদিও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মান্নান দাবি করেন, ওই শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। এরপরও কেন ওই শিক্ষার্থীর ফল স্থগিত করা হলো- এ বিষয়ে তিনি পরিষ্কারভাবে কিছু বলতে পারেননি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন। এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। তাই এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
সন্দেহে তীর সিস্টেম এনালিস্ট-প্রোগ্রামারদের দিকে
ফল তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শিক্ষা বোর্ডে কর্মরত প্রোগ্রামার ও সিস্টেম এনালিস্টরা। কিন্তু ফল জালিয়াতির ঘটনাগুলো তাদের দিকে আঙুল তুলছেন বোর্ড কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের সিস্টেম অ্যানালিস্ট ও প্রোগ্রামার শাখার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি প্রশ্নের মুখে।
বোর্ড সূত্র জানায়, এসএসসি ও এইচএসসির ফল তৈরির প্রক্রিয়ায় ওএমআর শিট স্ক্যানিং এবং নম্বর এন্ট্রির পর তা লক হয়ে যায়। বোর্ডের অত্যন্ত সুরক্ষিত সার্ভারে প্রবেশ করে নম্বর পরিবর্তন করা আইটি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা বোর্ডে ফল জালিয়াতচক্রের শক্তিশালী সিন্ডিকেটও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খাতা মূল্যায়নে দৃশ্যমান গাফলতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যেসব শিক্ষক গাফলতি করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। এবার পাবলিক পরীক্ষা আইনে তাদের ধরা হবে।—অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান
এর আগে ২০২৩ সালেও এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফল জালিয়াতির ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মামলা ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মধ্যরাতে শিক্ষক ডেকে ফল বাড়ানোর অভিযোগ
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডেও এসএসসির খাতা মূল্যায়ন নিয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে। পুনর্নিরীক্ষণের পর একই উত্তরপত্র বা খাতা ফের মূল্যায়ন করিয়ে নম্বর বাড়িয়ে দিতে পরীক্ষকদের চাপ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বোর্ড কর্মকর্তারা।
জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষণের খাতা মূল্যায়ন শেষ হয়। অথচ পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে ২৭ জন শিক্ষককে বোর্ডে ডেকে এনে বিভিন্ন বিষয়ের খাতা পুনরায় যাচাই করানো হয়। সেসময় কিছু খাতায় ফলাফল বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
জানতে চাইলে রাজশাহী বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ফলাফল পরিবর্তনের জন্য শিক্ষক বা পরীক্ষকদের ডাকা হয়নি। পুনর্নিরীক্ষণের পর বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে প্রত্যাশার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী ফেল করায় বিষয় দুটি আবার যাচাই করতে বলা হয়েছিল। দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজন থাকায় রাতে শিক্ষকদের বোর্ডে আনা হয়েছিল।
ফল পরিবর্তনে রেকর্ড, নেপথ্যে মূল্যায়নে গাফলতি
এবার এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের পর প্রায ১৩ লাখ উত্তরপত্র বা খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে।
পুনর্নিরীক্ষণের পর নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন। ফেল থেকে পাস করেছে ৪ হাজার ৫৮৫ জন। ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের খাতার নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। আর জিপিএ বা গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসএসসি ও এইচএসসিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়বে। তাই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সামান্য গাফিলতিও একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঘোষণা শিক্ষা বোর্ডের
খাতা মূল্যায়নে গাফলতি করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খাতা মূল্যায়নে দৃশ্যমান গাফলতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যেসব শিক্ষক গাফলতি করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। এবার পাবলিক পরীক্ষা আইনে তাদের ধরা হবে।’
রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা দর্শন ঠিক না করে বিক্ষিপ্তভাবে চালালে এমন ঘটনা অহরহ ঘটবে। আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন কীভাবে হবে, সেটি মন্ত্রী বা সচিব বলে দেন। এটা বিশ্বে অন্য কোথাও নেই। অথচ এগুলো শিক্ষা এক্সপার্টদের বলার কথা।—অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান
বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, যেসব পরীক্ষকের খাতায় ১০ নম্বরের বেশি বা কম দেওয়া হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। আগামী রোববার এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফল জালিয়াতির ঘটনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা বোর্ডে এমন কোনো ঘটনা নেই। অন্য যে বোর্ডগুলোতে এমন ঘটনা সামনে এসেছে, সেখানে তদন্ত চলছে। তদন্তে যারা অপরাধী প্রমাণিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রাষ্ট্রের শিক্ষাদর্শন ঠিক করার তাগিদ শিক্ষাবিদের
শিক্ষাব্যবস্থা বিক্ষিপ্তভাবে চলায় এমন পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা দর্শন ঠিক না করে বিক্ষিপ্তভাবে চালালে এমন ঘটনা অহরহ ঘটবে। আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন কীভাবে হবে, সেটি মন্ত্রী বা সচিব বলে দেন। এটা বিশ্বে অন্য কোথাও নেই। অথচ এগুলো শিক্ষা এক্সপার্টদের বলার কথা।’
এসএসসির মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মূল্যায়নের এমন চিত্রে দায়িত্বের অবহেলা স্পষ্ট। বোর্ডের খাতা যারা দেখবেন, তারাও লবিং করেন। এমন ঘটনা চলতে থাকলে কোনো পরিবর্তন হবে না।’
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় কী এমন প্রশ্নে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, দেশে শিক্ষা কমিশন দরকার। তবে সেটি যেন দলীয় কমিশন না হয়। কারণ শিক্ষা সবার। এটি বিএনপি, জামায়াত বা আওয়ামী লীগের নয়। একটি যুগোপযোগী শিক্ষা কমিশন, শিক্ষা আইনই বিপর্যয় থেকে আমাদের বাঁচাতে পারবে।
এএএইচ/এমকেআর





