সারে সর্বনাশ
ধানের চারা মাটিতে বসানোর পর কৃষকের সবচেয়ে বড় ভরসা থাকে আকাশের বৃষ্টি আর মাটির উর্বরতার ওপর। কিন্তু সেই ভরসার সঙ্গে যখন সারের বস্তাটি অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন সংকটটি আর শুধু কৃষকের থাকে না; তা ধীরে ধীরে খাদ্যনিরাপত্তা, বাজার, মূল্যস্ফীতি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়। বাংলাদেশের কৃষকের কাছে সার কোনো বিলাসপণ্য নয়। এটি ফসলের প্রাণ। অথচ সেই সার নিয়েই এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে পুরোনো এক দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়ে যায়।
সরকার বলছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অক্টোবর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সম্ভাব্য চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টন; এর বিপরীতে প্রস্তুত সরবরাহ ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় উদ্বৃত্ত থাকার কথা প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন। কিন্তু কৃষকের প্রশ্ন খুব সরল: যদি সার থাকে, তাহলে সেটি আমার হাতে নেই কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ গুদামে সার থাকা আর কৃষকের জমিতে সময়মতো সার পৌঁছানো এক কথা নয়। রাষ্ট্রের সাফল্য গুদামের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না; কৃষকের মাঠে সঠিক সময়ে, নির্ধারিত দামে এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণে সার পৌঁছেছে কি না, সেটিই আসল পরীক্ষা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সার না পাওয়ার অভিযোগ, বেশি দামে সার কেনা, সড়ক অবরোধ, ডিলারের গুদামে ভাঙচুর কিংবা জোর করে সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। কুড়িগ্রামে কৃষকেরা ডিলারের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে; রাজশাহীতে প্রায় ৩০০ কৃষক মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।
সরকারের বক্তব্য, সংকট মূলত সরবরাহব্যবস্থার কিছু ত্রুটি, কোথাও কোথাও মজুত ও বাজারজাতকরণে অনিয়ম এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে। কৃষকেরা আবার বলছেন, নির্ধারিত ডিলারের দোকানে সার পাওয়া যাচ্ছে না; বাধ্য হয়ে খোলা বাজারে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় ৫০ কেজির বস্তায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি হয়তো জাতীয় পর্যায়ে মোট সারের পরিমাণের ঘাটতি নয়; বরং কোথায় কত সার আছে, কার কাছে আছে, কখন আছে এবং কোন দামে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে—সেখানেই বড় প্রশ্ন। এই জায়গাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা যখন কৃষকের ক্ষেতে উৎপাদনের সময়সূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখন কাগজের উদ্বৃত্তও মাঠের ঘাটতিতে পরিণত হয়।
কৃষি কোনো অপেক্ষার শিল্প নয়। ধানের চারা কৃষকের সঙ্গে আলোচনা করে বেড়ে ওঠে না। নির্দিষ্ট সময়ে সার দিতে হয়, সেচ দিতে হয়, আগাছা দমন করতে হয়। একটি সপ্তাহের বিলম্বও অনেক সময় ফলনের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে কৃষক যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পান না, তখন তাঁর কাছে ‘দেশে পর্যাপ্ত মজুত আছে’—এই সরকারি বক্তব্যের কোনো বাস্তব অর্থ থাকে না।
কৃষককে সার দিতে হবে সময়মতো, ন্যায্যমূল্যে, সম্মানের সঙ্গে। কারণ কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো মানে শুধু একটি বস্তা রাসায়নিক উপকরণ পৌঁছানো নয়; এর অর্থ একটি পরিবারের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা, একটি ফসলকে বাঁচানো, একটি বাজারকে স্থিতিশীল রাখা এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করা।
এখানেই ইতিহাসের সতর্কবার্তাটি মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশে সার নিয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট নতুন নয়। ১৯৯৪ সালের শেষ ভাগ থেকে ১৯৯৫ সালের শুরুতে দেশে ভয়াবহ সার-সংকট দেখা দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, তখন ইউরিয়ার সরবরাহ ঘাটতির সঙ্গে বিতরণব্যবস্থায় সরকারের ভুল হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে সংকটে ঠেলে দেয়। একই সময়ে বোরো আবাদে চাহিদা বেড়ে যায়। উৎপাদন কমার পাশাপাশি ইউরিয়া রপ্তানিও বেড়েছিল, ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়।
পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ। ১৯৯৫ সালের মার্চে সার-সংকট ও উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও সরকারি গুদাম থেকে সার নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, কোথাও সড়ক অবরোধ হয়েছে, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। সমকালীন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৮ কৃষক নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অন্য একটি মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চের ঘটনায় পুলিশ গুলি চালালে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। আবার পরবর্তী বিভিন্ন বাংলাদেশি প্রতিবেদনে ১৭ বা ১৮ কৃষকের মৃত্যুর কথা এসেছে।
সংখ্যার এই পার্থক্য ইতিহাসের মূল বেদনাটিকে বদলে দেয় না। সত্য হলো, সার চেয়েছিলেন কৃষক, আর সেই দাবির আন্দোলনে কৃষকের রক্ত ঝরেছিল। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে লজ্জাজনক দৃশ্য আর কী হতে পারে—যে কৃষক নিজের জমিতে খাদ্য উৎপাদন করবেন, তাঁর হাতে সার তুলে দেওয়ার বদলে তাঁর দিকে বন্দুক তাক করতে হবে?
সেই ঘটনার প্রায় তিন দশক পর আজকের বাংলাদেশে একই ইতিহাস যেন অন্য ভাষায় ফিরে আসছে। এখনই পরিস্থিতিকে ১৯৯৫ সালের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। আজ জাতীয় পর্যায়ে সারের মজুত সম্পর্কে সরকার যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে, তাতে মোট সরবরাহের ঘাটতির চিত্র নেই। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, সংকট কেবল উৎপাদনের ঘাটতি থেকে তৈরি হয় না; প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভুল পূর্বাভাস, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ডিলারদের অনিয়ম এবং মজুতদারিও একটি পর্যায়ে গিয়ে সংকটকে বিস্ফোরক করে তুলতে পারে। তাই ‘সার আছে’—এই বক্তব্যের সঙ্গে ‘কৃষক সার পাচ্ছেন কি না’—এই প্রশ্নটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষকের সার পাওয়ার অধিকারকে কেবল বাজারের একটি লেনদেন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অংশ। একজন কৃষক যদি নির্ধারিত দামে সার না পান এবং বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন, তাহলে তাঁর উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ধানের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে। খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। অর্থাৎ ডিলারের দোকানের সামনে শুরু হওয়া একটি ছোট সংকট শেষ পর্যন্ত শহরের ভোক্তার রান্নাঘরেও পৌঁছাতে পারে।
এখন দরকার অভিযোগের পাল্টাপাল্টি নয়, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা। প্রতিটি উপজেলায় কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কোন ডিলার কত পেয়েছেন, কত বিক্রি করেছেন এবং কত মজুত আছে—এই তথ্য জনসম্মুখে নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় ডিলারভিত্তিক মজুত ও বিক্রির তথ্য কৃষকের জন্য উন্মুক্ত করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা কৃষি-কার্ডভিত্তিক সীমিত ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে বিক্রির হিসাবও রাখা সম্ভব। এতে একজন ডিলার একই সার একাধিকবার কাগজে বিক্রি দেখিয়ে বাজারে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমবে।
একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে আকস্মিক পরিদর্শন, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে বলেছে, অনিয়মকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিতরণব্যবস্থার সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ চলছে। কিন্তু ঘোষণা যথেষ্ট নয়; কৃষককে তার ফল দেখতে হবে।
আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কৃষককে কখনোই সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না। কৃষক কেন বেশি সার চাইছেন, তিনি কেন দোকানের সামনে ভিড় করছেন, কেন ক্ষুব্ধ হচ্ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তাঁর বাস্তব উৎপাদন পরিস্থিতির মধ্যে। কোথাও অতিরিক্ত চাহিদা থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। কিন্তু সার না দিয়ে কৃষককে ‘আতঙ্কিত’ বা ‘মজুতদার’ বলে দায়ী করা সমস্যার সমাধান নয়।
একই সঙ্গে কৃষকদেরও আইন হাতে তুলে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। কারণ এতে শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলাই বাড়বে এবং প্রকৃত কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। কৃষককে সার না দিয়ে, পরে তাঁর ক্ষোভকে অপরাধ হিসেবে দেখলে রাষ্ট্র সমস্যার মূল কারণটি আড়াল করতে পারবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, সারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উপকরণ বানানো যাবে না। অতীতের ভুলের দায় বর্তমান সরকারের নয়—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়ার দায় বর্তমানের। ১৯৯৫ সালের রক্তাক্ত অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কৃষকের ক্ষোভকে অবহেলা করার মূল্য ভয়াবহ হতে পারে। সেই ইতিহাস কোনো দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশের কৃষক বহুবার এই দেশকে খাদ্যসংকট থেকে টেনে তুলেছেন। বন্যা এসেছে, খরা এসেছে, ঘূর্ণিঝড় এসেছে, মহামারি এসেছে—তবু কৃষক মাঠ ছাড়েননি। সেই কৃষকের হাতে যখন সার নেই, তখন রাষ্ট্রের হাতে শুধু পরিসংখ্যান থাকলে চলবে না। গুদামের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটি দ্রুত কমাতে হবে।
সার নিয়ে সংকটকে ছোট করে দেখার সময় নেই। কারণ সারের সংকট শুধু সারের সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের আয়, খাদ্যের দাম, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা। আজ ডিলারের দোকানের সামনে যে উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে, কাল তা বাজারের চালের বস্তায় প্রতিফলিত হতে পারে।
তাই এখনই একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—সার যেন কৃষকের জন্য অভিশাপ না হয়, সার যেন রাজনৈতিক সংঘাতের কারণ না হয়, সার যেন রাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষকের দূরত্বের প্রতীক না হয়। সবচেয়ে বড় কথা, সার যেন আর কখনো কৃষকের রক্তের কারণ না হয়।
১৯৯৫ সালের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে: খাদ্য উৎপাদনকারী মানুষের দাবির জবাব কি প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও শক্তি প্রয়োগ দিয়ে দেওয়া হবে, নাকি তার আগেই রাষ্ট্র কৃষকের পাশে দাঁড়াবে? উত্তরটি শুধু সরকারের নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
কৃষককে সার দিতে হবে সময়মতো, ন্যায্যমূল্যে, সম্মানের সঙ্গে। কারণ কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো মানে শুধু একটি বস্তা রাসায়নিক উপকরণ পৌঁছানো নয়; এর অর্থ একটি পরিবারের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা, একটি ফসলকে বাঁচানো, একটি বাজারকে স্থিতিশীল রাখা এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করা। সার থাকবে গুদামে নয়, কৃষকের হাতে—এটাই হওয়া উচিত এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
drharun.press@gmail.com
এইচআর/জেআইএম


