সম্প্রীতির শিক্ষা ভুলে কেন বিভেদের পথে?

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ হিসেবে আমরা সবাই একই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত এবং একই বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আজ আমরা একে অপরের প্রতি মারমুখী অবস্থানে থাকতেই যেন বেশি পছন্দ করি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভু-প্রতিপালকের তাকওয়া অবলম্বন করো, যিনি একই সত্তা থেকে তোমাদের...

শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ হিসেবে আমরা সবাই একই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত এবং একই বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আজ আমরা একে অপরের প্রতি মারমুখী অবস্থানে থাকতেই যেন বেশি পছন্দ করি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভু-প্রতিপালকের তাকওয়া অবলম্বন করো, যিনি একই সত্তা থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তাঁর সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন আর তাদের উভয় থেকে বহু নর ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১)

আল্লাহপাক সব আদম সন্তানকে প্রভূত সম্মান ঠিকই দান করেছেন, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা সেই সম্মান ধরে রাখতে পারিনি। সব আদম সন্তানকে আল্লাহতায়ালা সমভাবে সম্মানিত করেছেন এবং কোনো বিশেষ জাতি বা গোত্রের প্রতি পক্ষপাতমূলক ব্যবহার করেননি। একজন মানুষ, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তার মূল পরিচয় হলো : সে আদম সন্তান আর আদম সন্তান হিসেবে সব ধর্মের মানুষ একই উম্মত।

আল্লাহপাকের কাছে সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী। মানুষ হিসেবে তিনি কাউকে পৃথক করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং একই উম্মাহ। কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষ বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। যেমন, পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, ‘আর মানবজাতি একই সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে তারা মতভেদ করল।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ১৯)

আসলে নবী (আ.)-এর মৃত্যুর পর নবীর অনুসারীরা সাধারণত নিজেদের মধ্যে মতভেদ আরম্ভ করে এবং দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর প্রত্যেক দলই মনে করে, তারাই নবীর সত্য অনুসারী এবং অন্যরা ভ্রান্ত। কিন্তু সব নবীর অনুসারীই আদম-হাওয়ারই বংশধর।

আল্লাহপাক এই পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন মানবের সংশোধন করার জন্য আর দলে-উপদলে বিভক্ত না হয়ে সবাই যেন একই সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করে। একক নেতৃত্বের অধীনে থেকে জীবন পরিচালিত করাই আল্লাহপাকের ইচ্ছা আর এ লক্ষ্যেই তিনি নবী-রাসুলদের প্রেরণ করেছেন।

আজ আমরা পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ভুলে বসেছি। যার ফলে কারও সঙ্গে সামান্য মতের অমিল হলেই শুরু করে দিই অন্যায়-অত্যাচার। অথচ মুসলিমের প্রতিবেশী যদি অমুসলিম হয়, তার সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ধরনের অধিকারের খেয়াল রাখা জরুরি করেছে ইসলাম।

আজ মুসলিম জাহানের অবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যায়, তাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। সমগ্র মুসলিম জাহান আজ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারী মুসলমানরা আজ নিজেরাই নিজেদের শত্রু হয়ে আছে।

এক জাতি হিসেবেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন। যেভাবে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় তোমাদের এই উম্মত একই উম্মত এবং আমিই তোমাদের প্রভু-প্রতিপালক। অতএব তোমরা আমার ইবাদত করো।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৯২)

আবার বলা হয়েছে, ‘আর জেনে রাখো, তোমাদের এ সম্প্রদায় একটিই সম্প্রদায়। আর আমি তোমাদের প্রভু-প্রতিপালক।’ (সুরা মোমেনুন, আয়াত : ৫২)

সবার সৃষ্টি যেহেতু একই ঐশী উৎস থেকে, তাই সবার মূল কাজ হলো সবার মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করা। আজ মাজহাব নিয়ে চলছে দ্বন্দ্ব। সমগ্র বিশ্বে মাজহাবের ফেরে পুড়ছে মুসলমান।

আজ পাকিস্তানে যেমন সুন্নিরা আক্রান্ত হচ্ছে শিয়াদের দ্বারা, শিয়ারা আক্রান্ত হচ্ছে সুন্নিদের দ্বারা, আবার আহমদিয়ারা আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাকিস্তানে আজ এমন কোনো দিন অতিবাহিত হয় না, যেখানে মাজহাবের ফেরে প্রত্যেক দিন নিরীহ মানুষের প্রাণ হারাতে হয়। এছাড়া ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেনসহ বিশ্বের বহু দেশে কেবল এই মাজহাবের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাতে হচ্ছে অনেকের। এক মুসলমান ভাই অপর মুসলমানের আঘাতে মরছে আর এর জন্য সহায়তা করছে অপর কেউ, অথচ আমরা পড়ে আছি মাজহাব নামক শব্দের খাঁচায় বন্দি হয়ে।

সব ধর্মের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছে ইসলাম। ধর্ম পালনে কেউ কাউকে বাধা দেবে না। অন্য ধর্ম নিয়ে কেউ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা যাবে না মর্মেও পবিত্র কুরআনে আয়াত নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা (মূর্তিপূজক) ডাকে, তাদের তোমরা গালি দিও না। তাহলে তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গালি দেবে।’ (সুরা আনআম : ১০৮)

বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করার পর যে মদিনা-সনদ প্রণয়ন করেন, তা বিশ্ব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান এবং শান্তি-সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল। এই সনদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাসহ সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ধারা সন্নিবেশিত রয়েছে। যেমন, সনদে স্বাক্ষরকারী সব গোত্র-সম্প্রদায় মদিনা রাষ্ট্রে সমান অধিকার ভোগ করবে; সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের স্ব-স্ব ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার যথারীতি বহাল থাকবে; কেউ কারও ওপর কোনো রূপ আক্রমণ করবে না; সন্ধিভুক্ত কোনো সম্প্রদায় বহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে উক্ত আক্রান্ত সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করতে হবে এবং শত্রুদের প্রতিহত করতে হবে; কোনো নাগরিক কোনো অপরাধ করলে তা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। (সিরাতে ইবনে হিশাম)

আজ আমরা অনেক ক্ষেত্রে মহানবির অতুলনীয় এই সম্প্রীতির শিক্ষা ভুলে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছি। মহানবির (সা.) মৃত্যুর অল্পদিন আগে বিদায় হজের সময় বিরাট ইসলামী সমাগমকে সম্বোধন করে তিনি (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,

‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তোমাদের আদি পিতাও এক। একজন আরব একজন অনারব থেকে কোনো মতেই শ্রেষ্ঠ নয়। তেমনি একজন আরবের ওপরে একজন অনারবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। একজন সাদা চামড়ার মানুষ একজন কালো চামড়ার মানুষের চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়, কালোও সাদার চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়। শ্রেষ্ঠত্বের মূল্যায়ন করতে বিচার্য বিষয় হবে, কে আল্লাহ ও বান্দার হক কতদূর আদায় করল। এর দ্বারা আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বাপেক্ষা বেশি ধর্মপরায়ণ।’ (বায়হাকি)

এই মহান শব্দগুলো ইসলামের উচ্চতম আদর্শ ও শ্রেষ্ঠতম নীতিমালার একটি দিক উজ্জ্বলভাবে চিত্রায়িত করেছে। শতধা বিভক্ত একটি সমাজকে অত্যাধুনিক গণতন্ত্রের সমতাভিত্তিক সমাজে ঐক্যবদ্ধ করার কী অসাধারণ উদাত্ত আহ্বান।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত। ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় তিনি কারও প্রতি কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ করেননি। অন্যায়ের ক্ষেত্রেও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। অন্যায়ভাবে কোনো মুসলিমের পক্ষ অবলম্বনও করেননি।

তিনি ছিলেন ন্যায়ের প্রতীক। মানুষ হিসেবে তিনি সবার প্রতি ছিলেন উদার ও উত্তম আচরণকারী। প্রতিবেশী যে-ই হোক, অর্থাৎ মুসলিম কিংবা অমুসলিম, তার অধিকারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সজাগ দৃষ্টিসম্পন্ন।

আজ আমরা পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ভুলে বসেছি। যার ফলে কারও সঙ্গে সামান্য মতের অমিল হলেই শুরু করে দিই অন্যায়-অত্যাচার। অথচ মুসলিমের প্রতিবেশী যদি অমুসলিম হয়, তার সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ধরনের অধিকারের খেয়াল রাখা জরুরি করেছে ইসলাম।

আজও আমরা যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ উদার নীতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে বিশ্বব্যাপী আবারও বইবে শান্তির সুবাতাস। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো ধর্মীয় ফেরকা বা সম্প্রদায়কে পছন্দ নাও করতে পারি, তাই বলে এ নিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলার কোনো অনুমতি ইসলাম ও আমার প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেয়নি। যেভাবে মহানবি (সা.) ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, সাম্য-মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন রচনা করে আদর্শ-কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অদ্বিতীয় নজির স্থাপন করেছেন, ঠিক তেমনি তাঁর উম্মত হিসেবে আমাদেরকেও সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

সম্প্রীতির এই দেশে যদি কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করে, তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের প্রতিহত করতে হবে। আমরা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেব না।

আমাদের এ দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। হাজার বছরের এই ঐতিহ্যকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। এছাড়া আমাদের সংবিধান দেশের সব নাগরিককে স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালনের অধিকার প্রদান করেছে। তাই বিভেদ ভুলে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থেকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ
masumon83@yahoo.com

এইচআর/জেআইএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/opinion/article/1156015
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Business