নাইন-ইলেভেন: মাত্র ১০২ মিনিটে বদলে যায় পৃথিবীর ইতিহাস
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের অন্যান্য দিনের মতো তখনো স্বাভাবিক কর্মব্যস্ত সকাল। কেউ অফিসে ঢুকছেন, কেউ বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ পর্যটক হিসেবে তাকিয়ে আছেন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সুউচ্চ ভবন দুটির দিকে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে যায় ভয়াবহ এক ঘটনায়।
চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই, নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আঘাত, পেন্টাগামে হামলা এবং পেনসিলভানিয়ার আকাশে চতুর্থ বিমানের পতন ১১ সেপ্টেম্বরের সেই সকাল শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের রাজনীতি ও নিরাপত্তার চিত্র।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ১৯ জন আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে সমন্বিত হামলা চালায়। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ ও সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে, তৃতীয়টি আঘাত করে ওয়াশিংটন ডিসির কাছে পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার একটি খোলা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন।

শুরুটা হয়েছিল আকাশে
সেদিন সকালে চারটি বিমান যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে যাচ্ছিল। ছিনতাইকারীরা বিমানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সেগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হামলা চালায়।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১১ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে ভবনের ওপরের অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে অনেকেই এটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু ১৭ মিনিট পর ঘটে দ্বিতীয় আঘাত।
সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে। তখন আর সন্দেহের অবকাশ ছিল না এটি একটি সমন্বিত হামলা। দুটি ভবনেই তখন হাজার হাজার মানুষ ছিলেন। হামলার পর অনেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। একই সময়ে দমকলকর্মী, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা উল্টো ভবনের ভেতরে ঢুকছিলেন আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনতে। ৯/১১ মেমোরিয়ালের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সে আনুমানিক ১৬ হাজার ৪০০ থেকে ১৮ হাজার মানুষ ছিলেন। তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

তারপর আঘাত পেন্টাগনে
নিউইয়র্কে যখন উদ্ধারকাজ চলছে, তখন হামলার আরেকটি অংশ বাস্তবায়িত হয়। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৭৭ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত করে। একই সময়ে দেশজুড়ে বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর আসে ৯/১১-এর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর একটিউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৯৩।
ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা অন্য তিনটি হামলার খবর জানতে পেরেছিলেন। তারা বুঝতে পারেন, বিমানটি যে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে সেটিও সম্ভবত হামলার লক্ষ্য। এরপর কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
তাদের প্রতিরোধের পর বিমানটি সকাল ১০টা ৩ মিনিটে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি খোলা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি ওয়াশিংটন ডিসির দিকে যাচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়। যাত্রীদের এই প্রতিরোধের ফলে সেটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
ওদিকে ধসে পড়লো টুইন টাওয়ার
এর মধ্যেই নিউইয়র্কে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে সাউথ টাওয়ার ধসে পড়ে। এর মাত্র ২৯ মিনিট পর, সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে, নর্থ টাওয়ারও ভেঙে পড়ে। বিমানের আঘাতের ফলে ভবনের কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পাশাপাশি জ্বলন্ত বিমানের জ্বালানি থেকে তৈরি তীব্র আগুন ভবনের কাঠামোকে আরও দুর্বল করে। শেষ পর্যন্ত দুই টাওয়ারই ধসে পড়ে।
একসময়ের ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। ধসে পড়ার সময় আশপাশের আরও কয়েকটি ভবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। উদ্ধার ও অনুসন্ধানের বিশাল অভিযান শুরু হয় সঙ্গে সঙ্গেই।

৯/১১-তে কত মানুষ প্রাণ হারান?
হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৭৫৩ জন নিউইয়র্কে, ১৮৪ জন পেন্টাগনে এবং ৪০ জন ফ্লাইট ৯৩-এ ছিলেন। নিহতরা এসেছিলেন ৯০টি দেশ থেকে। তবে ৯/১১-এর ক্ষয়ক্ষতি শুধু সেদিনের প্রাণহানিতেই থেমে থাকেনি। উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরবর্তী বছরগুলোতে হামলার স্থানে কাজ করা উদ্ধারকর্মী ও অন্যদের স্বাস্থ্যগত সমস্যাও সামনে আসে।
শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা নয়, ইতিহাসের মোড়
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি, বিমানবন্দর নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানসহ পরবর্তী বহু আন্তর্জাতিক ঘটনার সঙ্গে ৯/১১-এর সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
তবে সময় যতই পেরিয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বরের স্মৃতি শুধু ধ্বংসের গল্প হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে স্বজন হারানো পরিবার, শেষ মুহূর্তে মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা করা দমকলকর্মী-পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক এবং ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীদের সাহসেরও গল্প।
আজ নিউইয়র্কের সেই জায়গায় দাঁড়ালে টুইন টাওয়ার নেই। রয়েছে দুটি বিশাল স্মৃতিফলক, যেখানে নিহতদের নাম খোদাই করা। ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়ামের ভাষায়, সেই দিনের ইতিহাস শুধু কীভাবে হামলা হয়েছিল তা নয় তার আগে কী ঘটেছিল, সেদিন মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল এবং পরবর্তী পৃথিবী কীভাবে বদলে গেল, সেই পুরো গল্পও।
১১ সেপ্টেম্বর তাই কেবল একটি তারিখ নয়। এটি এমন এক সকাল, যার কয়েক ঘণ্টা বদলে দিয়েছিল নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং মানুষের পৃথিবীকে আর যার ক্ষত আজও ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট।
সূত্র: হিস্টোরি ডটকম, অল দ্য ইন্টেরেস্টিং
কেএসকে




