ফোন-ল্যাপটপ বা গ্যাজেটে ডাস্টবিনের ওপর ক্রস চিহ্ন কেন থাকে জানেন?
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, চার্জার কিংবা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস হাতে নিয়ে দেখেছেন কি, কোথাও একটি ছোট ডাস্টবিনের ছবি রয়েছে এবং তার ওপর মোটা করে ক্রস চিহ্ন দেওয়া? অনেকেই এটিকে সাধারণ কোনো সতর্কতামূলক প্রতীক মনে করেন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত বার্তা।
ডিভাইসের গায়ে থাকা এই চিহ্নটি মূলত জানিয়ে দেয়, পণ্যটির ব্যবহার শেষ হয়ে গেলে সেটিকে সাধারণ গৃহস্থালির আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া উচিত নয়। কারণ ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সাধারণ বর্জ্যের মতো নয়। এগুলোর ভেতরে থাকা বিভিন্ন উপাদান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং একই সঙ্গে অনেক মূল্যবান উপাদান পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
ডাস্টবিনের ওপর ক্রসের অর্থ কী?
ডাস্টবিনের ওপর ক্রস দেওয়া প্রতীকটি সাধারণভাবে ডব্লিউইইই (ওয়েস্ট ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট) চিহ্ন হিসেবে পরিচিত। সহজ করে বললে, এটি একটি নির্দেশনা এই ইলেকট্রনিক পণ্যটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেলে সাধারণ ময়লার ঝুড়িতে ফেলা যাবে না।
অর্থাৎ, আপনার পুরোনো মোবাইল, ল্যাপটপ, চার্জার বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক-ইলেকট্রনিক যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে সেটিকে নির্দিষ্ট ই-ওয়েস্ট সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার আওতায় দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে পণ্যটি নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়।
কেন সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলা যাবে না?
ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের ধাতু, প্লাস্টিক, ব্যাটারি ও অন্যান্য উপাদান থাকে। কিছু পুরোনো বা নির্দিষ্ট ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্যে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থও থাকতে পারে।
এ ধরনের বর্জ্য যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ফেলে রাখা হয় বা ভুল পদ্ধতিতে ভাঙা হয়, তাহলে ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মাটি ও পানিদূষণের পাশাপাশি ই-ওয়েস্টের অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ দুইয়ের জন্যই সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ডব্লিউইইই প্রতীক মূলত ব্যবহারকারীকে আগে থেকেই সতর্ক করে দেয় এই পণ্যটির জীবনচক্র শেষ হলেও এর দায়িত্ব শেষ হয়নি।
ই-ওয়েস্ট আসলে কী?
সহজ ভাষায়, যে বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক যন্ত্র আর ব্যবহার করা হচ্ছে না কিংবা ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়েছে, সেটিই ই-ওয়েস্টের অংশ হতে পারে। পুরোনো স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মনিটর, প্রিন্টার, চার্জার, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, কন্ট্রোলার, ডিসপ্লে এসবই ব্যবহারের শেষে ই-বর্জ্যে পরিণত হতে পারে। শুধু বড় যন্ত্র নয়, ছোট ইলেকট্রনিক অ্যাকসেসরিজও ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আসতে পারে।
শুধু ফেলে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়
একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস নষ্ট হওয়ার পর সেটিকে সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে মিশিয়ে দিলে সমস্যাটি চোখের আড়ালে চলে যায়, কিন্তু শেষ হয় না। বরং বর্জ্যটি কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিকভাবে সংগ্রহ করা হলে ই-ওয়েস্ট থেকে বিভিন্ন উপাদান আলাদা করে পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে একদিকে পরিবেশের ওপর চাপ কমে, অন্যদিকে কিছু মূল্যবান কাঁচামালও পুনরুদ্ধার করা যায়।
এই কারণেই অনেক দেশে পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, কোথাও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, আবার কোথাও অনুমোদিত রিসাইক্লিং সংস্থা এই কাজ করে থাকে।
সব দেশে কি একই নিয়ম?
না। ডব্লিউইইই প্রতীক আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হলেও ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার আইন ও বাস্তবায়ন দেশভেদে আলাদা। ইউরোপে এই প্রতীক বিশেষভাবে পরিচিত এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে একই ধরনের একক বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই। তবে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, শহর ও স্থানীয় প্রশাসনের নিজস্ব ই-ওয়েস্ট রিসাইক্লিং কর্মসূচি ও আইন রয়েছে। ফলে সেখানে পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য পুনর্ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও নিয়ম স্থানভেদে আলাদা হতে পারে।
পুরোনো গ্যাজেট কী করবেন?
আপনার ফোন, ল্যাপটপ বা চার্জার নষ্ট হয়ে গেলে সরাসরি বাড়ির ময়লার ঝুড়িতে না ফেলে আগে স্থানীয়ভাবে ই-ওয়েস্ট সংগ্রহের ব্যবস্থা আছে কি না খোঁজ নেওয়া ভালো। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা অনুমোদিত রিসাইক্লিং কেন্দ্র পুরোনো ডিভাইস সংগ্রহ করে।
বিশেষ করে পুরোনো ফোন বা কম্পিউটার দেওয়ার আগে ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলা, প্রয়োজনীয় ব্যাকআপ নেওয়া এবং ডিভাইসে থাকা অ্যাকাউন্ট থেকে সাইন-আউট করাও জরুরি।
তাই পরেরবার স্মার্টফোনের পেছনে, চার্জারের গায়ে কিংবা ল্যাপটপের নিচে ডাস্টবিনের ওপর ক্রস চিহ্নটি দেখলে সেটিকে নিছক একটি লোগো ভাববেন না। ছোট্ট এই প্রতীক আসলে মনে করিয়ে দেয় ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার শেষ হলেও তার সঠিক নিষ্পত্তির দায়িত্ব শেষ হয় না।
কেএসকে




