কাজ না করেই চার প্রকল্পের পুরো টাকা লোপাট
ভোলা পৌরসভার চারটি ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পে বরাদ্দ ১২ লাখ ৫৯২ টাকা। কাগজে-কলমে এসব প্রকল্পের জন্য বাস্তবায়ন কমিটিও আছে, বরাদ্দের টাকাও উত্তোলন হয়েছে। কিন্তু মাঠে গিয়ে মিলছে না প্রকল্পের কাজের কোনো চিহ্ন। উল্টো বাস্তবায়ন কমিটিতে থাকা পৌরসভার পাঁচ কর্মচারী বলছেন, এসব প্রকল্পের কাজ সম্পর্কেই তারা জানেন না। ফলে কাজ ছাড়াই সরকারি বরাদ্দের টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে।
ভোলা পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে টিআর প্রকল্পের আওতায় পৌর এলাকার ড্রেন নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারের জন্য চারটি প্রকল্পে মোট ১২ লাখ ৫৯২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সদর রোডের বরিশাল দালানসংলগ্ন সংযোগ ড্রেন নির্মাণে ৩ লাখ টাকা, সদর রোডের ঘোষপট্টি সংলগ্ন সংযোগ ড্রেন নির্মাণ এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আমিরুল ইসলামের বাসার সীমানা ড্রেন থেকে আবহাওয়া অফিসের বাউন্ডারি সংলগ্ন ড্রেন মেরামত ও নির্মাণে সাড়ে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মেঘনার ভাঙনে হুমকির মুখে ভোলা শহর
এ ছাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোষপট্টি সড়কের ড্রেন সংস্কার ও মেরামতে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৫৯২ টাকা এবং কাশিশ্বর ব্রিজ থেকে খাদ্য গুদাম পর্যন্ত ড্রেন সংস্কার ও মেরামতে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বরাদ্দের বিপরীতে প্রকল্পগুলোর বাস্তব অবস্থা জানতে সরেজমিনে গিয়ে কোনো ড্রেন নির্মাণ, সংস্কার বা মেরামতের কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

‘পৌরসভায় চাকরি করা ব্যক্তিদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে রেখে ‘সমাজসেবক’ দেখানো হয়েছে। এখন বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি করছেন’
বরিশাল দালান এলাকার ব্যবসায়ী কিরণ ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনির হোসেন বলেন, কয়েক বছর ধরে বরিশাল দালানসংলগ্ন সংযোগ ড্রেনের কোনো কাজ হয়নি। কয়েক মাস আগে বরিশাল দালানের সামনে মাটি খোঁড়া হয়েছিল। দুই দিন পর আবার বালু দিয়ে সেটি ভরাট করা হয়।
তারা বলেন, ওই সময় জানতে চাইলে তাদের বলা হয়েছিল সেখানে ড্রেনের কাজ হবে। কিন্তু এরপর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ড্রেনের কোনো কাজ হয়নি।
‘সাত-আট বছর আগে কাশিশ্বর ব্রিজ থেকে খাদ্য গুদাম পর্যন্ত ড্রেনের কাজ হয়েছিল। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি। এমনকি সংস্কার বা মেরামতের কাজও হয়নি’
অন্যদিকে খাদ্য গুদামসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. ইবাদুর রহমান ও মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, সাত-আট বছর আগে কাশিশ্বর ব্রিজ থেকে খাদ্য গুদাম পর্যন্ত ড্রেনের কাজ হয়েছিল। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি। এমনকি সংস্কার বা মেরামতের কাজও হয়নি।
তাদের ভাষ্য, এ বছর ওই ড্রেন সংস্কার ও মেরামতের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের কথা তারা শুনেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সংস্কার বা মেরামতের কাজ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাহিম ইসলাম বলেন, চারটি প্রকল্পে মোট ১২ লাখ ৫৯২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি বলে তারা দেখেছেন। তার অভিযোগ, কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে।
‘প্রকল্পের টাকা ফেরত যাতে না যায়, সে জন্য টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে বর্ষা ও তার বদলির কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যে কাজ হবে’- ভোলা পৌরসভার সাবেক প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান
তিনি বলেন, পৌরসভায় চাকরি করা ব্যক্তিদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে রেখে ‘সমাজসেবক’ দেখানো হয়েছে। এখন বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি করছেন।

রাহিম ইসলাম আরও বলেন, সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তিনি।
চার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পৌরসভার পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি করা হয়। এতে মো. আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি, মো. ফারুককে সম্পাদক এবং জাকীর হোসেন, মো. হাসান ও ইয়াকুবকে সদস্য করা হয়। কমিটির নথিতে তাদের সবাইকে সমাজসেবক হিসেবে দেখানো হয়েছে। টিআর যাচাই-বাছাই উপকমিটির সভাপতি ছিলেন ভোলা পৌরসভার সাবেক প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান।

৪০ বছরেও পাকা হলো না ভোলার এক কাঁচা সড়ক
বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য মো. জাকীর হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে আমি বা কমিটির অন্য সদস্যরা কিছুই জানেন না। সাবেক প্রশাসক মিজানুর রহমানের কথায় তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় স্বাক্ষর করেছেন।
জাকীর হোসেন জানান, তাকে কাগজপত্র জমা দিতে বলায় তিনি ভেবেছিলেন পৌরসভা থেকে কোনো অনুদান বা বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ কারণে কোনো প্রশ্ন না করেই কাগজপত্র জমা ও স্বাক্ষর করেছেন।
প্রকল্পের কাজ না করে অর্থ উত্তোলন এবং বাস্তবায়ন কমিটিতে পৌরসভার কর্মচারীদের ‘সমাজসেবক’ হিসেবে দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ভোলা পৌরসভার সাবেক প্রশাসক ও বর্তমানে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড, রাজশাহীর পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, পৌরসভার পাঁচ কর্মচারী পৌরসভার নাগরিক হওয়ায় তাদের বাস্তবায়ন কমিটি বা সিপিপি সদস্য করা হয়েছে। এতে কোনো অপরাধ নেই। বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য হলেই কাজ কোথায় হবে, তা তাদের জানা থাকবে—এমন নয়।

এ যেন বাতির নিচে অন্ধকার!
প্রকল্পের কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, প্রকল্পের টাকা ফেরত যাতে না যায়, সে জন্য টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে বর্ষা ও তার বদলির কারণে কাজ করা সম্ভব হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যে কাজ হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ভোলা পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘নথিপত্র ও সরেজমিনে গিয়ে আমরা বিষয়টি দেখছি। বৃষ্টির কারণে হয়তো কাজটি হয়নি। তবে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ নেই।’
নথিপত্র যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর প্রকল্পগুলোর বাস্তব অবস্থা এবং বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় বা উত্তোলন করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কেএইচকে/জেআইএম



