৩৭২ দিনের অপেক্ষার অবসান: ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার মুক্তির দিন
একটি দিন, একটি মুক্তি। আর সেই মুক্তি ঘিরে অগণিত মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ১১ সেপ্টেম্বর—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী মানুষের কাছে দিনটি তাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। দিনটি মনে করিয়ে দেয় ৩৭২ দিনের বন্দিদশা, উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা আর শেষ পর্যন্ত প্রিয় নেত্রীর মুক্তির সেই আবেগঘন মুহূর্তের কথা।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আটক থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পান। সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। তার আগে কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৭২ দিন।
যে দিন শুরু হয়েছিল অপেক্ষা
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে আটক করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। আটকের পর তাকে আদালতে হাজির করা হয়। জামিন নামঞ্জুর করে সংসদ ভবন এলাকার একটি ভবনে বন্দি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সেই ভবনই পরিণত হয় বিশেষ কারাগারে। এরপর শুরু হয় অপেক্ষার দীর্ঘ অধ্যায়।
দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর
কারাগারের বাইরে প্রতিদিন অপেক্ষা করতে থাকেন দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও আত্মীয়স্বজন। উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটে যেতে থাকে একেকটি দিন।
প্রিয় নেত্রী কবে মুক্তি পাবেন—এই অপেক্ষাই যেন হয়ে ওঠে তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
১১ সেপ্টেম্বরের সকাল, বদলে গেল দৃশ্যপট
অবশেষে আসে সেই দিন—২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।
৩৭২ দিনের বন্দিদশার অবসান ঘটে। বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া।
মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথে নেমে আসে মানুষের ঢল।
কারও হাতে ফুল। কারও চোখে আনন্দাশ্রু। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় নেত্রীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা।
যে অপেক্ষার প্রতিটি দিন ছিল উদ্বেগে ভরা, সেই অপেক্ষার শেষ মুহূর্তটি হয়ে ওঠে আনন্দ ও আবেগের।
একদিকে ৩৭২ দিনের বন্দিদশার অবসান, অন্যদিকে প্রিয় নেত্রীকে ফিরে পাওয়ার উচ্ছ্বাস—দুই অনুভূতি মিলেমিশে ১১ সেপ্টেম্বরকে করে তোলে স্মরণীয় এক দিন।
সময় পেরিয়েছে, স্মৃতি পেরোয়নি
এরপর কেটে গেছে বহু বছর। রাজনীতির মাঠে বদল এসেছে, বদলেছে সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের স্মৃতি মুছে যায়নি। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী মানুষের কাছে দিনটি এখনো ফিরে আসে সেই মুক্তির দিনের স্মৃতি নিয়ে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলাও ছিল নানা উত্থান-পতন, সংগ্রাম, দুর্ভোগ ও প্রতিকূলতায় ভরা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাকে নানা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
তার অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন আপসহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের প্রতীক।
আর সেই দীর্ঘ পথচলার একটি বিশেষ অধ্যায় হয়ে আছে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর—যেদিন ৩৭২ দিনের বন্দিদশার পর তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন।
শেষ অধ্যায়ও ছিল মানুষের ভালোবাসায়
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যু বরণ করেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তা ছিল নজিরবিহীন। জীবনের শেষ অধ্যায়েও মানুষের ভালোবাসায় ঘেরা ছিলেন তিনি।
দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জানাজা শেষে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে।
একসময় যে নেত্রীর মুক্তির অপেক্ষায় রাজপথে মানুষ দাঁড়িয়েছিল, শেষ বিদায়েও তাকে ঘিরে মানুষের ঢল নেমেছিল। তাই ১১ সেপ্টেম্বর শুধু একটি তারিখ নয় ১১ সেপ্টেম্বরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপেক্ষার গল্প। জড়িয়ে আছে উদ্বেগের দিনগুলো। জড়িয়ে আছে বন্দিদশার স্মৃতি। আবার জড়িয়ে আছে মুক্তির আনন্দ, ফুল হাতে অপেক্ষা করা মানুষ আর চোখের আনন্দাশ্রু।
৩৭২ দিনের অপেক্ষার পর যে দিনটি এসেছিল মুক্তির বার্তা নিয়ে, বহু বছর পরও সেই দিনটি স্মৃতির পাতায় অমলিন।
বেগম খালেদা জিয়া আজ নেই। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতির সঙ্গে ১১ সেপ্টেম্বরও থেকে গেছে একটি আবেগঘন অধ্যায় হয়ে।
একটি তারিখ—যে তারিখ একসময় বলেছিল, দীর্ঘ অপেক্ষারও একদিন শেষ হয়।
কেএইচ/এমআইএইচএস




