মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একজন মানুষ তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহকারীকে জিজ্ঞেস করল, “আজ আমার কী করা উচিত?” প্রশ্নটি শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এই প্রশ্নটির অর্থ আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। কারণ সেই AI হয়তো শুধু দিনের কাজের তালিকা তৈরি করবে না। সে জানবে ম...

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একজন মানুষ তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহকারীকে জিজ্ঞেস করল, “আজ আমার কী করা উচিত?”

প্রশ্নটি শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এই প্রশ্নটির অর্থ আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। কারণ সেই AI হয়তো শুধু দিনের কাজের তালিকা তৈরি করবে না। সে জানবে মানুষটি গত বিশ বছরে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোন সিদ্ধান্তে সফল হয়েছে, কোথায় ভুল করেছে, কোন বিষয় তাকে আনন্দ দেয়, কোন পরিস্থিতিতে সে দুর্বল হয়ে পড়ে, তার আর্থিক অবস্থা কেমন, তার পেশাগত দক্ষতা কোথায়, এমনকি কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার বিচারবুদ্ধি আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়।

অর্থাৎ, AI তখন আর কেবল একটি যন্ত্র থাকবে না। সেটি হয়ে উঠতে পারে মানুষের “দ্বিতীয় মস্তিষ্ক”।

আজ আমরা প্রযুক্তিকে মূলত এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখি, যা মানুষের কাজকে সহজ করে। ক্যালকুলেটর হিসাব করে, কম্পিউটার তথ্য বিশ্লেষণ করে, রোবট শারীরিক কাজ করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লেখা, ছবি, গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। কিন্তু প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপটি সম্ভবত আরও গভীর। প্রযুক্তি শুধু মানুষের কাজ করবে না, মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ারও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

তখন প্রশ্নটি আর থাকবে না, “প্রযুক্তি আমাদের কী কাজ করে দেবে?”

প্রশ্নটি হবে, “প্রযুক্তি কি একদিন মানুষের কাজই শুধু করবে, নাকি মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও নিজের হাতে নিয়ে নেবে?”

এই পরিবর্তনটি মানবসভ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাজের একটি অংশ যন্ত্রকে দিয়ে দেওয়া এবং নিজের সিদ্ধান্তের একটি অংশ যন্ত্রকে দিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়।

একজন মানুষ যদি AI-কে বলে, “এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করো”, সেখানে মানুষ সিদ্ধান্তের মালিক। কিন্তু যদি সে বলতে শুরু করে, “আমার জন্য সিদ্ধান্ত নাও”, তখন সম্পর্কটি বদলে যায়।

ধরা যাক, একজন তরুণ নতুন একটি চাকরির প্রস্তাব পেল। আজ সে হয়তো বেতন, কর্মপরিবেশ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নিজের পছন্দ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। ভবিষ্যতে তার দ্বিতীয় মস্তিষ্ক হয়তো তার অতীতের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্ব, আর্থিক লক্ষ্য, মানসিক প্রবণতা এবং চাকরির বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলবে, “এই চাকরিটি গ্রহণ করলে পাঁচ বছর পরে তোমার জীবনের সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে।”

তখন মানুষ হয়তো AI-কে প্রশ্ন করবে, “আমি যদি এটা করি, পাঁচ বছর পরে এর কী পরিণতি হতে পারে?”

এটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি ক্ষমতা। মানুষ এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যেগুলোর ভবিষ্যৎ পরিণতি সে নিজে অনুমান করতে পারে না। AI বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুযোগ দেখাতে পারে। চিকিৎসা, শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবসা, পরিবেশ, ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা এমনকি দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যবহার মানুষের সিদ্ধান্তকে আরও তথ্যভিত্তিক করতে পারে।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। যদি মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক মানুষের চেয়েও ভালো সিদ্ধান্ত দিতে পারে, তাহলে মানুষ কি ধীরে ধীরে নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করাই বন্ধ করে দেবে?

মানুষের মস্তিষ্ক শুধু তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না। সেখানে অভিজ্ঞতা আছে, আবেগ আছে, মূল্যবোধ আছে, ভালোবাসা আছে, ভয় আছে, সাহস আছে, ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা আছে। অনেক সময় মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরিসংখ্যানের দৃষ্টিতে সেরা নয়, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিতে সঠিক।

একজন মা তার সন্তানের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা কোনো অ্যালগরিদম হয়তো অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত মনে করবে না। একজন মানুষ কোনো বন্ধুকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে পারেন, যদিও অতীতের তথ্য তাকে সতর্ক করে। একজন বিজ্ঞানী এমন একটি ধারণার পেছনে ছুটতে পারেন, যার সফলতার সম্ভাবনা খুব কম, কিন্তু সেই ঝুঁকিই একদিন নতুন আবিষ্কারের জন্ম দিতে পারে।

মানুষের এই অযৌক্তিকতার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতা আছে।

তাই যদি আমরা প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে AI-এর কাছে যাই এবং তার পরামর্শকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে আমরা হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বাঁচব, কিন্তু একই সঙ্গে হারিয়ে ফেলতে পারি নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

আর তখন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদটি কোনো রোবটের বিদ্রোহ নয়। বরং মানুষ নিজেই ধীরে ধীরে নিজের চিন্তার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে।

আরও একটি প্রশ্ন তখন সামনে আসবে। “যে AI আপনার সম্পর্কে আপনার নিজের চেয়েও বেশি জানে, শেষ পর্যন্ত আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নেবে কে, আপনি, নাকি আপনার AI?”

এখানে ব্যক্তিগত তথ্যের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ককে কার্যকর করতে হলে তাকে মানুষের সম্পর্কে বিপুল তথ্য জানতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সম্পর্ক, পেশা, অভ্যাস, পছন্দ, দুর্বলতা, যোগাযোগ, ভ্রমণ, কেনাকাটা, চিন্তার ধরন, এমনকি আমাদের নীরবতার অর্থও যদি কোনো প্রযুক্তি বুঝতে শুরু করে, তাহলে সেটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী তথ্যভান্ডারে পরিণত হবে।

প্রশ্ন হলো, সেই তথ্যের মালিক কে? মানুষ নিজে? কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি? কোনো রাষ্ট্র? নাকি এমন একটি অ্যালগরিদম, যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াই মানুষ পুরোপুরি বুঝতে পারে না? এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ সমাজের চরিত্র নির্ধারণ করতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তিকে শুধু বিপদের চোখে দেখাও ভুল হবে। মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক মানবসভ্যতার অন্যতম উপকারী আবিষ্কারও হতে পারে। একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত AI-এর সাহায্যে নিজের দুর্বলতা বুঝে শিক্ষা নিতে পারে। একজন কৃষক আবহাওয়া, মাটি ও বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একজন বিজ্ঞানী কোটি কোটি তথ্যের মধ্যে এমন সম্পর্ক খুঁজে পেতে পারেন, যা মানুষের একার পক্ষে অসম্ভব। একজন প্রবীণ মানুষ তার জীবনের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে পারেন।

অর্থাৎ, দ্বিতীয় মস্তিষ্ক মানুষের প্রথম মস্তিষ্ককে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, বরং তাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু একটি শর্ত আছে। AI-কে মানুষের বিবেকের বিকল্প হতে দেওয়া যাবে না। AI বলতে পারে কোন সিদ্ধান্তটি বেশি কার্যকর। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তটি নৈতিক, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব মানুষেরই থাকা উচিত।

AI বলতে পারে কোন পথে ঝুঁকি কম। কিন্তু কোন ঝুঁকি নেওয়া মূল্যবান, সেটি মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। AI ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখাতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যৎ কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তি দিতে পারে না। কারণ প্রযুক্তির কাছে তথ্য থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের কাছে থাকে মূল্যবোধ।

সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা হবে আরও দ্রুত কম্পিউটার, আরও শক্তিশালী রোবট বা আরও বুদ্ধিমান AI তৈরি করা নয়। বরং প্রশ্ন হবে, মানুষ কীভাবে এমন প্রযুক্তি তৈরি করবে, যা মানুষের ক্ষমতা বাড়াবে কিন্তু মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে না?

আমাদের হয়তো এমন একটি নতুন নীতির প্রয়োজন হবে: “AI আমার সহকারী, আমার মালিক নয়।”

মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক আমাদের ভুল কমাতে পারে। আমাদের স্মৃতি বাড়াতে পারে। আমাদের জ্ঞান বাড়াতে পারে। আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা দিতে পারে। কিন্তু জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটি যদি সবসময় যন্ত্রের হাতে তুলে দিই, তাহলে একদিন হয়তো আমরা অত্যন্ত দক্ষ মানুষে পরিণত হব, কিন্তু নিজের জীবনের প্রকৃত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী থাকব না।

তখন হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটি সেই ব্যক্তি হবে না যার AI সবচেয়ে শক্তিশালী। বরং সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ হবে সেই ব্যক্তি, যে জানে কখন AI-এর কথা শুনতে হবে এবং কখন নিজের বিবেকের কথা শুনতে হবে।

প্রযুক্তি মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক হতে পারে। কিন্তু মানুষের প্রথম মস্তিষ্ক, তার বিবেক, স্বাধীন চিন্তা এবং মানবিকতা যেন কখনো তার দ্বিতীয় স্থানে নেমে না যায়।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তি কতটা বুদ্ধিমান হয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ তার নিজের বুদ্ধি, বিবেক ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতদিন নিজের কাছে রাখতে পারবে? সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব হবে না মানুষের জন্য চিন্তা করা। বরং হবে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা, যা মানুষকে আরও ভালোভাবে নিজে চিন্তা করতে শেখাবে।

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com

এমআরএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/probash/news/1156225
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Business