গণপতি পরিবার হত্যা: বিচার বিভাগীয় তদন্তের রিটের শুনানি ৮ সপ্তাহ মুলতবি
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এবং আলামত নষ্টের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের শুনানি আট সপ্তাহের জন্য (স্ট্যান্ডওভার) মুলতবি করেছেন হাইকোর্ট।
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আজহার উল্লাহ ভূইয়া ও চঞ্চল কুমার বিশ্বাস। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এর আগে জনস্বার্থে গত ৩০ আগস্ট রিটটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী মোস্তফা কামাল ও শেখ গোলাম কিবরিয়া। তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন হাসান আল মামুন। রিট দায়েরের বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন আইনজীবী নিজে।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সিআইডি প্রধান, পিবিআই মহাপরিচালক, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, রংপুরের পুলিশ সুপার, কোতোয়ালি থানার ওসি এবং রংপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।
শুনানি শেষে আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, আদালত মৌখিকভাবে বলেছেন, যেহেতু মামলাটি সিআইডি বা ডিবির কাছে গেছে, আদালতও বিষয়টি দেখছে এবং সুপারভিশনে থাকবে। তদন্তের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখতে রিটটি আট সপ্তাহের জন্য (স্ট্যান্ডওভার) মুলতবি রাখা হয়েছে।
রংপুর মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়া বা দাসপাড়ার বাসা থেকে গত ২২ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় পরদিন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। পরে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে গ্রেফতার করে।
রিট আবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে নানান অসঙ্গতি রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও পৃথক সময়ে দেওয়া বক্তব্যে হত্যার স্থান ও ঘটনাক্রমে পরিবর্তন এসেছে। এসব কারণে ঘটনাটি নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৩ আগস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হয়, ২৭ আগস্টের বক্তব্যে হত্যার স্থান ও ঘটনাক্রমে পরিবর্তন আসে। এ ছাড়া ঘটনাস্থল অপরাধস্থল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পর সেখানে পানির পাম্প চালানোর অভিযোগও ওঠে।
রিটে দাবি করা হয়, পানির প্রবাহের কারণে ঘটনাস্থলে থাকা রক্ত, ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, পায়ের ছাপসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত ক্ষতিগ্রস্ত বা দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আলামত নষ্ট, পরিবর্তন, গোপন, সরিয়ে নেওয়া বা দূষিত হলে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস এবং এতে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে রিটে বলা হয়, ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, ঘটনাক্রম এবং প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত প্রয়োজন।
এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টের সাবেক বা বর্তমান কোনো বিচারপতি অথবা উপযুক্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার নেতৃত্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে। ওই কমিটিতে ফরেনসিক, চিকিৎসা, সাইবার ফরেনসিক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ রাখারও আবেদন করা হয়েছে।
এছাড়া রুলের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা এবং কোনো ধরনের পরিবর্তন, পরিষ্কার, ধোয়া, মেরামত, অপসারণ বা আলামত সরানো থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত রাখার অন্তর্বর্তী নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
গত ২০ আগস্ট দিনগত রাতে রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাসায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুষকে হত্যা করা হয়। পরে ২২ আগস্ট রাতে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
এফএইচ/কেএসআর




