কবিতা ও কথাসাহিত্যে কামরুল হাসান বাদলের মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
আলী প্রয়াস বাংলা কথাসাহিত্য ও কবিতার প্রচলিত ছককে ভেঙে নন্দনতত্ত্বের কানাগলিতে দাঁড়িয়ে যিনি যুগপৎ সময়ের কোলাহল ও শ্মশানের নৈঃশব্দ্যকে মূর্ত করেন; তিনি কামরুল হাসান বাদল। মফস্বল ও মহানগরের প্রান্তিক দ্বৈরথ তার সৃষ্টির আঁতুড়ঘর। তার সাহিত্যিক অবয়ব বহুমাত্রিক। ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ, সা...

আলী প্রয়াস

বাংলা কথাসাহিত্য ও কবিতার প্রচলিত ছককে ভেঙে নন্দনতত্ত্বের কানাগলিতে দাঁড়িয়ে যিনি যুগপৎ সময়ের কোলাহল ও শ্মশানের নৈঃশব্দ্যকে মূর্ত করেন; তিনি কামরুল হাসান বাদল। মফস্বল ও মহানগরের প্রান্তিক দ্বৈরথ তার সৃষ্টির আঁতুড়ঘর। তার সাহিত্যিক অবয়ব বহুমাত্রিক। ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা এবং ছোটগল্পে তার পদচারণা গভীর। তবে তার সামগ্রিক শিল্পপ্রয়াস আসলে এক সংবেদী চেতনার ধারাবাহিক রূপান্তর। হতাশার নিকষ অন্ধকার থেকে নান্দনিকতার আলোর দিকে এক অনন্ত যাত্রা। তার সৃষ্টির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, তা চলমান সময়ের রাজনৈতিক অবক্ষয় এবং মানুষের অস্তিত্ববাদী সংকটের জটিল মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস।

আমাদের শহরের অতি পরিচিত লেখক কামরুল হাসান বাদলের শিল্পসত্তা শুরু থেকেই রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন ছিল না। তার ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা গল্প—সবকিছুই এক অনমনীয় রাজনৈতিক চেতনায় ঋদ্ধ। তার চার দশকের সক্রিয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন তার প্রতিটি পঙক্তিকে অগ্নিগর্ভ করেছে। তার রাজনৈতিক চেতনার চারটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, প্রশ্নাতীত বঙ্গবন্ধু-প্রীতি এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের তীব্র বিরোধিতা। ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশের ইতিহাস যে অন্ধকার বাঁকে মোড় নেয়, তার গভীর ক্ষত তরুণ বাদলকে আজীবন তাড়িত করেছে। পরবর্তীতে এসবেরই আয়না হয়ে ওঠে তার সৃজনসত্তা। এখানে তার কবিতা ও কথাসাহিত্য নিয়ে সামান্যটুকু আলোচনার অবকাশ পাব।

২.
কামরুল হাসান বাদলের কাব্য সংখ্যার বিচারে ক্ষীণ হলেও গুণগত দিক থেকে তা অত্যন্ত পরিশীলিত। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে প্রকাশিত তার তিনটি কাব্যগ্রন্থ শব্দের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদিন জ্যোৎস্নার স্পর্ধায়’ (১৯৯৪) মূলত এক অবক্ষয়িত সময়ের সমষ্টিগত হতাশার চিত্র। ‘এখানে মৃত্যু’ কবিতায় এই সামগ্রিক ক্ষোভ ও হতাশা মূর্ত হয়ে উঠেছে, ‘আমরা ধ্বংস এবং মৃত্যুর সাথে/ পাশাপাশি বসে আছি/ যেনো একটি প্রাচীন নগর/ প্রাগৈতিহাসিকতার ধুলোয় ঢাকা।’ যে উপত্যকায় রবীন্দ্রনাথ, মুজিব কিংবা ৭ মার্চের অবিনশ্বর বজ্রকণ্ঠ হারিয়ে গেছে প্রাচীন ডাইনোসরের ছায়ায়, সেখানে এক গভীর সমষ্টিগত নৈরাশ্য গ্রাস করে সমাজকে। কিন্তু বাদল কেবল হতাশার কালো জলে পাঠককে নিমজ্জিত রাখেন না; কবি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার অপরাজেয় শক্তিতেই মুক্তি খোঁজেন। তিনি অবলীলায় লেখেন—‘ভালোবাসাহীন মানুষ কিছুই সৃষ্টি করে না।’

প্রথম বইয়ের তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভ ও ক্রোধ দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূপদেশে স্বর্ণচূড়া’য় (১৯৯৯) এসে অনেকটাই প্রশমিত ও অবগাহনে রূপ নেয়। এখানে তিনি প্রকৃতিঘনিষ্ঠ এবং ইঙ্গিতে-ইশারায় চিত্রকল্প তৈরিতে সচেষ্ট। ‘দৃশ্য-এক’ কবিতায় স্নানঘরে চুল থেকে জল ঝরাকে যখন তিনি ‘নায়াগ্রা প্রপাত’ বলেন, তখন ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি এক অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘জিরাফের মতো দুপুরগুলো’ কাব্যে বাদলের নন্দনবোধ আরও পরিপক্ব এবং অস্তিত্ববাদী রূপ ধারণ করে। জিরাফের দীর্ঘ গ্রীবা ও উদ্যত ভঙ্গির রূপক নাগরিক জীবনের রিরংসা ও নিস্তব্ধতাকে চিহ্নিত করে। ‘ডানাকাটা’ কবিতায় তিনি আমাদের চিরন্তন বাস্তবতার ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে লেখেন, ‘মেয়েটির ডানা ছিল না তবুও/ উড়ছিল... আরেকটি মেয়ে/ অনবদ্য দুটি ডানা নিয়ে/ পাশে বসেছিল।’

বাহ্যিক সামর্থ বা ডানা থাকলেই মানুষ মুক্ত হয় না; বরং দৃশ্যমান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষ তার অন্তর্গত আত্মিক শক্তিতে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে উড়তে পারে—এই পরাবাস্তব তত্ত্বই কবি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন। ‘বিশ্বনাগরিক’ কবিতায় তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি ও করপোরেট সংস্কৃতির জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের ক্ষীয়মাণ প্রাণের হাহাকার তুলে ধরেন। আর ‘আমার ঘর’ কবিতার অবসান ঘটে এক ভয়ংকর অস্তিত্ববাদী সংকটে, যেখানে কবরস্থানের পাশের কাছারিঘরে বসবাসকারী কবিকে এক মৃত মানুষ বারবার কবরের দিকে আঙুল তুলে বলে, ‘ওই যে তোমার ঘর, তুমি খুঁজে পাচ্ছো না।’

৩.
কামরুল হাসান বাদলের কবিতা ও কলাম পড়েই অভ্যস্ত ছিলাম দীর্ঘদিন। হঠাৎই তার গল্পে আস্বাদন নিলাম অত্যন্ত ব্যতিক্রমভাবে। পড়তে গিয়ে পেলাম অন্য জাদুর ছোঁয়া। গল্পের মূল অবয়ব গড়ে ওঠে নিরেট, চেনা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে। সেই চেনা বাস্তবতার ফাটল গলে ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে যৎসামান্য ম্যাজিক-রিয়েলিজম। লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের মূলধারা যেখানে অলৌকিকতাকে আখ্যানের ভিত্তিভূমি বানায়, বাদল সেখানে অবলীলায় ঘটান উল্টো পুরাণ। তার গল্পবিশ্বে জাদুবাস্তবতা কোনো অলীক কল্পনা বা রূপকথা নয় বরং তা রূঢ় বাস্তবতাকে আরও তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলার নান্দনিক অনুঘটক। এই ধরুন ‘সুনীলের কুকুরটা’ গল্পের কথা যদি বলি, এই গল্পে মানুষের ভাষায় কথা বলা কুকুরটি আসলে কোনো রূপকথা নয়। সেটি নাগরিক মানুষের অন্তর্গূঢ় একাকিত্বের পরাবাস্তব প্রতিবিম্ব। কুকুরটি যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা আউড়ে বলে—আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে...’ তখন বাস্তবতার দেওয়াল নিমেষেই ভেঙে যায়। অথচ সেই পরাবাস্তবতা আমাদের চেনা রোজকার জগতের খুব কাছাকাছি থিতু হয়। তখন গভীর রাতের নীরবতায় মানুষ ও পশুর ভাষার ব্যবধান ঘুচে যায়। এটি আসলে নগরের নিশাচর মানুষের একাকিত্ব এবং অস্তিত্বের সংকটের এক পরাবাস্তব রূপক।

একইভাবে, ‘খুন ও হুইসেল’ গল্পের মূল চরিত্র বিহারী শামসুইয়া যখন নিজের রক্তাক্ত লাশ নিজেই দেখে এবং দ্বিতীয়বার গুলিবিদ্ধ হয়ে মরে, তখন পাঠককে এক তাত্ত্বিক দোলাচলে ফেলে দেয়। চরিত্রটি জীবিত নাকি মৃত—এই অমীমাংসিত রহস্য গল্পের গভীরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আবার ‘কর্পূর’ গল্পে মৃত্যুর ছয়দিন পর কবর থেকে বাতেন সাহেবের উঠে আসা এবং ঊর্ধ্বতন সহকর্মীর টিফিন বক্স থেকে রুটি-তরকারি খাওয়ার ঘটনাটি চরম আধিভৌতিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। লাশের গায়ে লেগে থাকা কর্পূরের ঘ্রাণ আর করিমুল্লাহর দোদুল্যমানতা আসলে আমাদের চারপাশের চেনা বাস্তবতার নির্মম বিনির্মাণ। ‘আবসেরাব’ গল্পে শখের বশে দাড়ি কামিয়ে মহিউদ্দিনের যে চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক হেনস্থার শিকার হয়, তা এক তীব্র শ্লেষাত্মক ও বাস্তবধর্মী দলিল। কৃত্রিম আবহ নির্মাণ না করে জীবনকে ঠিক যেভাবে আছে, সেভাবেই মানবিক মূল্যবোধের নবমূল্যায়নে তুলে ধরা বাদলের এই ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

শুরুতেই বলেছিলাম বাদলের চিন্তা রাজনীতি মুক্ত নয়, রাজনীতি না করেও ছোটগল্পের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক রূপকের সার্থক প্রকাশ ঘটেছে ‘রহিমা’ গল্পে। রহিমা এখানে স্বয়ং দুখিনী বাংলাদেশ। স্বদেশের ঐতিহ্যবাহী কথকতার ঢঙে রচিত এই রূপক আখ্যানে যখন স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষেরা অলৌকিক বোতলের ছিপি খুলে পুরোনো দৈত্য-দানবদের অবমুক্ত করে দেয়; তখন তা সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার ভয়ংকর পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়। তবে গল্পের শেষে ‘এবং পুনশ্চ’ উপশিরোনামে বাদল এক দুর্মর আশাবাদের বীজ বুনে দেন। তিনি বিশ্বাস করেন—‘কিন্তু একদিন এই মাটি কথা কইবেই... আবার আসিবে ফাগুন, আসিবে দিন...’

কামরুল হাসান বাদল একাধারে সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। পেশাগত জীবনের এই রূঢ় অভিজ্ঞতা তার কথাসাহিত্যে তীব্র সামাজিক অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘ঘাড়ত্যাড়া বাচ্চু’ গল্পটি মফস্বল সাংবাদিকতার জীবন্ত ও নির্ভীক আলেখ্য। সুবিধাবাদী ও হলুদ সাংবাদিকতার বিপরীতে আবদুল লতিফ বাচ্চু এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। ভণ্ডপীরের বিজ্ঞাপন বাণিজ্যের কারণে যখন মূলধারার পত্রিকা তার সত্যসন্ধ প্রতিবেদন ছাপে না, বাচ্চু তখন তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দেয়। তখন আমাদের বিচারব্যবস্থা ও সমাজকাঠামোর কঙ্কালটির মুখোশ খুলে যায়। বাচ্চুর দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হলেও তার অনমনীয় ঘাড় সোজা থাকে। ফেসবুকের মাধ্যমে খবর ভাইরাল হওয়ার মাঝেই সে তার পরম সার্থকতা খুঁজে পায়। এটি মূলত আমাদের পুঁজিতান্ত্রিক ও করপোরেট মিডিয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক তীব্র চপেটাঘাত।

একই রকম নির্মম কষাঘাত তিনি হেনেছেন প্রগতিশীল রাজনীতির অবক্ষয়ের ওপর ‘একটি মাদকতাহীন রাত’ গল্পে। আজীবন সর্বহারার রাজনীতি করা, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতে দেখতে বৃদ্ধ হওয়া তথাকথিত এক বাম নেতা প্রতি রাতে বারে গিয়ে মদ খান। অথচ তার কিশোর বয়সী কাজের ছেলেটির বহুদিনের অনুরোধ সত্ত্বেও তাকে একটা নতুন লুঙ্গি কিনে দেন না। উল্টো বুর্জোয়া ভণ্ডামিতে সান্ত্বনা দেন—‘সবুর কর সবুর কর, সবুরে মেওয়া ফলে।’ গল্পের চূড়ান্ত ট্র্যাজিক-কমেডি দৃশ্যমান হয়; যখন ছেলেটি দরজা খোলে সম্পূর্ণ লুঙ্গিহীন অবস্থায় এবং নির্বিকার গলায় বলে—‘কিছু না স্যার, সবুরে মেওয়া ফলেছে।’ কলমের মাত্র কয়েক আঁচড়ে বাদল এখানে প্রগতিবাদের অন্তর্গূঢ় নৈতিক দেউলিয়াত্বকে খোলসছাড়া করেছেন।

কামরুল হাসান বাদলের সাহিত্যের কোনো বাঁকবদলকারী হয়তো নন, কিন্তু তিনি এক পরম সৎ ও খাঁটি শব্দশ্রমিক। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের শর্ত এবং বনফুলের ক্ষুদ্রায়তন নিটোলতার চমৎকার মিশেলে তার কথাসাহিত্য। তার ভাষা আপাত সরল হলেও তা গূঢ় ও গভীর তাৎপর্যবাহী। জীবনের কঠিন বাস্তবতার জমিনে দাঁড়িয়েও তিনি যেভাবে অলৌকিক কর্পূরের সুবাস ছড়ান কিংবা জিরাফের গ্রীবার মতো উদ্যত দুপুরে বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেন, তা সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তাকে ব্যতিক্রমী কবি ও কথাকার হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

এসইউ

Original Source
https://www.jagonews24.com/literature/article/1156265
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Culture