সিলেটের আছে নিজস্ব বর্ণমালা, ঐতিহ্য ফিরছে সাইনবোর্ডে
একটি শহরকে শুধু তার রাস্তা, দালান কিংবা ব্যস্ত বাজার দিয়ে চেনা যায় না। শহরের আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার ভাষা, শব্দ, সংস্কৃতি আর মানুষের স্মৃতিতে। সিলেটের ক্ষেত্রেও তেমনই একটি পরিচয়ের নাম সিলেটি নাগরী। একসময় যে লিপিতে লেখা হতো পুঁথি, ধর্মীয় কাহিনি, প্রেম-বিরহের গল্প কিংবা চিঠি, সময়ের সঙ্গে সেই অক্ষরগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। তাই নগরীর আম্বরখানায় কোনো প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে নাগরী লিপির ব্যবহার চোখে পড়লে সেটি নিছক একটি নামফলক থাকে না; অনেকের কাছে হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের সঙ্গে নতুন করে পরিচয়ের মুহূর্ত।
সম্প্রতি আম্বরখানার একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে সিলেটি নাগরী লিপিতে নাম লেখার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্রহ তৈরি করেছে। এমন উদ্যোগ সত্যিই যদি নিয়মিতভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে নাগরীকে শুধু পুরোনো পুঁথি কিংবা জাদুঘরের সংগ্রহ হিসেবে দেখার ধারণা বদলাতে পারে। কারণ কোনো লিপি বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের চোখের সামনে তার ব্যবহারেও।

কোথা থেকে এলো সিলেটি নাগরী?
সিলেটি নাগরীকে ঘিরে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে একক মত নেই। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই লিপির ব্যবহার অন্তত চতুর্দশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত পিছিয়ে নেওয়া হয়। এর গঠনে বাংলা, আরবি, কৈথি ও দেবনাগরী লিপির প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কিছু গবেষণা এর সঙ্গে বিহার অঞ্চলে ব্যবহৃত কৈথি লিপির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলে। অর্থাৎ নাগরীর জন্মকাহিনি এখনো ইতিহাস ও ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়।
লোকমুখে অবশ্য নাগরীর সঙ্গে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও তার সঙ্গীদের আগমনের একটি গল্পও প্রচলিত রয়েছে। তবে এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের বদলে প্রচলিত বিশ্বাস হিসেবেই দেখা উচিত। নাগরীর উৎপত্তি সম্পর্কে একাধিক মত থাকলেও একটি বিষয়ে সন্দেহ কম সিলেট অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জীবনে এই লিপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
কেমন ছিল নাগরীর বর্ণমালা?
সিলেটি নাগরীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর সরলতা। প্রচলিত হিসাবে এতে ৩২টি অক্ষর রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্বরবর্ণ এবং ২৭টি ব্যঞ্জনবর্ণের কথা বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কিছু বর্ণনা ও স্থানীয় উৎসে অনুস্বারকে আলাদা ধরে সংখ্যাটি ৩৩ হিসেবেও পাওয়া যায়। বাংলা লিপির তুলনায় নাগরীর অক্ষর কম এবং জটিল যুক্তাক্ষরের ব্যবহারও ছিল না বললেই চলে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এটি তুলনামূলক সহজে শেখা সম্ভব ছিল।
এই সরলতার কারণেই নাগরী শুধু শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সিলেট অঞ্চলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে, পুঁথি পাঠ ও লেখালেখিতে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। জেলা পরিষদ সিলেটের তথ্যেও বলা হয়েছে, নাগরীর পুঁথিতে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, ইসলামী ইতিহাসের পাশাপাশি রাগ, বাউল ও মরমি সংগীতের বিষয়ও উঠে এসেছে।
পুঁথির পাতায় যে জীবন
নাগরী লিপির সঙ্গে সিলেটের পুঁথি সাহিত্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ধর্মীয় কাহিনি থেকে শুরু করে প্রেম, নীতি, আধ্যাত্মিকতা ও লোকজ জীবনের নানা গল্প জায়গা পেয়েছে এসব পুঁথিতে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, নাগরী লিপিতে লেখা প্রাচীনতম বিদ্যমান পাণ্ডুলিপিগুলোর একটি হলো গোলাম হুসনের ‘তালিব হুসন’, যার সময়কাল ১৫৪৯ সাল। পরে ‘রাগনামা’, ‘নূর নসিহত’, ‘হালাতুন নবী’সহ আরও বহু রচনা এই লিপির সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
উনিশ শতকে নাগরী ছাপার অক্ষরও তৈরি হয়। প্রায় ১৮৬০ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে সিলেটে নাগরী হরফের ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার কথা বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে। পরে বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে নাগরী বই প্রকাশিত হয়। ফলে হাতে লেখা পুঁথির গণ্ডি পেরিয়ে লিপিটি মুদ্রিত বইয়ের পাতাতেও জায়গা করে নেয়।
কেন হারিয়ে গেল?
সময়ের সঙ্গে বাংলা লিপির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার বাড়তে থাকে। শিক্ষা, প্রশাসন ও মুদ্রণব্যবস্থায় বাংলা লিপি ক্রমে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ফলে নাগরীর ব্যবহার কমতে শুরু করে। বিংশ শতকে এসে এই পতন আরও স্পষ্ট হয়। একসময় যে লিপি সাধারণ মানুষের হাতে ঘুরত, সেটিই ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে পুরোনো পুঁথি, গবেষণা ও কিছু সাংস্কৃতিক উদ্যোগে।
তবু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি নাগরী। গবেষক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিকর্মীদের নানা উদ্যোগে গত কয়েক দশকে এই লিপি সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা হয়েছে। এমনকি নাগরী লিপির জন্য ইউনিকোডেও আলাদা ব্লক রয়েছে, ফলে এখন কম্পিউটার ও ডিজিটাল মাধ্যমে এই অক্ষর ব্যবহার করা সম্ভব।
সাইনবোর্ডে ফিরে আসা মানে কী?
এই জায়গাতেই আম্বরখানার মতো কোনো জায়গায় নাগরী লিপির ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্য পায়। কারণ পুরোনো কোনো পুঁথির পাতায় নাগরী দেখা আর প্রতিদিনের শহুরে জীবনের সাইনবোর্ডে দেখা দুই অভিজ্ঞতা এক নয়। একটি সাইনবোর্ডে নিজের অঞ্চলের পুরোনো অক্ষর দেখলে হয়তো নতুন প্রজন্মের কেউ প্রথমবার জানতে চাইবে এগুলো কী অক্ষর? কেন সিলেটের নিজস্ব এমন একটি লিপি ছিল? সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হতে পারে ইতিহাস জানার পথ।
নাগরীকে ফিরিয়ে আনার অর্থ তাই বাংলা লিপিকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেকটি স্তরকে সামনে নিয়ে আসা। দোকান, প্রতিষ্ঠান, রাস্তার নাম কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি নাগরীর ব্যবহার বাড়লে অক্ষরগুলো আবার মানুষের দৈনন্দিন দৃশ্যপটে ফিরতে পারে।
কারণ কোনো লিপি তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন সেটি শুধু গবেষণার বিষয় নয় মানুষের চোখে পড়ে, কৌতূহল তৈরি করে, কেউ সেটি পড়তে শেখে এবং পরের প্রজন্মকে শেখায়। সিলেটি নাগরীর গল্প তাই কেবল হারিয়ে যাওয়া একটি বর্ণমালার গল্প নয়। এটি একটি অঞ্চলের মানুষের স্মৃতি, সাহিত্য, ধর্মীয় ও লোকজ সংস্কৃতির গল্প। আম্বরখানার একটি সাইনবোর্ড সেই পুরোনো গল্পকে যদি নতুন করে মানুষের সামনে আনে, তাহলে কয়েকটি অক্ষরের মধ্যেই হয়তো দেখা যাবে সিলেটের বহুদিনের হারানো এক আবেগের ফিরে আসা।
কেএসকে





