ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর ভরসা সৌদি আরব, থামছে না হুথিরা
ইয়েমেনে আবারও বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ। কয়েক দিনের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আরও এগিয়ে যাচ্ছে হুথিরা। তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এবার পাল্টা হামলা শুরু করেছে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী। তবে আকাশপথে ব্যাপক হামলা চললেও যুদ্ধের মাঠে এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে হুথিরা।
গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সরকারি বাহিনী। হুথিরা যেসব এলাকায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করছে কিংবা যোদ্ধাদের সমাবেশ ঘটাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেসব স্থানই হামলার প্রধান লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক বেশির ভাগ বিমান হামলা হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোচা শহরের দক্ষিণে ধুবাব জেলায়। এলাকাটি বর্তমানে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মোচা ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হুথিদের সামরিক সুবিধাও বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন এলাকা দখলের পাশাপাশি সমুদ্রপথে সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগও এখন তাদের আগের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সুবিধা পেয়েছে তারা।
এর আগে মোচা ও বাব আল-মান্দাব হুথিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ফলে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে তাদের মূলত দূরপাল্লার ও তুলনামূলকভাবে নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু কৌশলগত এসব এলাকা নিয়ন্ত্রণে আসার পর তাদের সামরিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে হুথিদের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু অস্ত্রশস্ত্র নয়, তাদের যুদ্ধকৌশলও। কোনো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তারা দ্রুত নিজেদের অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও যোদ্ধাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সরঞ্জাম গোপন বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়।
ফলে আকাশে যুদ্ধবিমান থাকলেও মাটিতে হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার, যোদ্ধা বা সামরিক সরঞ্জামের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর জন্য।
একটি এলাকায় হামলা শুরু হলে হুথিরা দ্রুত অন্যত্র সরে যেতে পারে। এ কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলা চললেও তাদের সামরিক শক্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানা কঠিন হয়ে উঠছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অবশ্য নতুন নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এসব হামলার পরও হুথিরা তাদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি হারায়নি। বরং গোপন ও ছড়িয়ে থাকা যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
এখন সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনর্দখল করা কতটা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের দখল ভাঙতে হলে বিমান হামলার পাশাপাশি স্থল অভিযানও প্রয়োজন হতে পারে। কারণ শুধু আকাশ থেকে হামলা চালিয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া কঠিন।
তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো স্থল অভিযানের খবর পাওয়া যায়নি। আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ছে, হুথিদের সম্ভাব্য সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রভাণ্ডারে হামলা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে মাটিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হুথিরা।
ফলে ইয়েমেনের নতুন এই লড়াইয়ে প্রশ্ন এখন শুধু কে কত বেশি হামলা চালাচ্ছে, তা নয়। শেষ পর্যন্ত কে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে এবং কে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকাগুলো দখলে রাখতে সক্ষম হয়—সেটিই হয়ে উঠছে সংঘাতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমআরএইস/এমএসএম
