দৌলতপুরে ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এখন বিপৎসীমার মাত্র ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে উপজেলার ৩৫টি গ্রামের অন্তত ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হাইড্রোলজি বিভাগ জানায়, শনিবার সকাল ৯ টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার (বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার)।
শুক্রবার সকাল ৯টায় এই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৩ সেন্টিমিটার। এর আগে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছিল।
পাউবোর হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে পদ্মায় দ্রুত পানি বেড়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধির হার কমে ৩ সেন্টিমিটারে নেমেছে। এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’
পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এবং ফিলিপনগর ইউনিয়নের পদ্মার চরের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ভেঙে গেছে যোগাযোগ সড়ক।
চিলমারী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তবে গত দুই-তিন দিনের তুলনায় শনিবার পানি বৃদ্ধির তীব্রতা কিছুটা কম।
অন্যদিকে রামকৃষ্ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, তার ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের চারপাশে পানি আর পানি। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নৌকা ও ভেলাই এখন চলাচলের একমাত্র ভরসা। এখানেও ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নে ইতোমধ্যে ৩৫১ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মরিচ ও কলা চাষিদের। পানি বাড়তে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
এদিকে পানি ওঠায় চরাঞ্চলের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে রান্নার স্থান ও নলকূপ। এতে দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও খামারিরা।
রামকৃষ্ণপুরের বাসিন্দা আবু বিশ্বাস (৬৫) বলেন, ‘ঘরের ভেতরে কোমর পর্যন্ত পানি। পরিবারের অন্যরা উঁচু জায়গায় গেলেও আমি মাচা বেঁধে কোনোমতে টিকে আছি।’
চর সোনাতলা এলাকার জুলেখা খাতুন বলেন, রাস্তা ভেঙে বন্যার পানি বাড়ির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, রান্নাবাড়া বন্ধ, বাড়ির সদস্যদের নিয়ে রান্না খাওয়া নিয়ে বিপাকে রয়েছি।
শেমল মন্ডল নামের একজন বলেন, বন্যার পানিতে আমার ৫ বিঘা মরিচ ডুবে গেছে। চলাচলে বেশ সমস্যা। বাড়ির বৃদ্ধরা ঘরবন্দি হয়ে রয়েছে। একবার রান্না করে তিনবার খেতে হচ্ছে। সাপের ভয় এখন বড় ভয় আমাদের।
এর পাশাপাশি চরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। স্থানীয়রা দ্রুত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসায় ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিমের দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। কাউকে সাপে কাটলে ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে আনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
আল-মামুন সাগর/কেজে/এএসএম
