সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী হয়েও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস কিনছে কাতার
ইরানের হামলায় কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতির পর ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আলোচনা শুরু করেছে কাতারএনার্জি। প্রতিষ্ঠানটি ২০৩১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কেনার জন্য একাধিক মার্কিন উৎপাদনকারীর সঙ্গে আলোচনা করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য ও জ্বালানি শিল্পসংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেঞ্চার গ্লোবাল, চেনিয়ের ও অস্ট্রেলিয়ার উডসাইড। এর মাধ্যমে কাতারএনার্জি ইরানের হামলায় হারানো এলএনজি সরবরাহের একটি দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগে কাতারএনার্জি মূলত তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুলসংখ্যক স্পট এলএনজি কার্গো কিনেছিল।
গত মার্চে ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনের ১৪টি ট্রেনের মধ্যে দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই হামলায় একটি গ্যাস-টু-লিকুইডস বা জিটিএল স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল-কাবি মার্চে জানিয়েছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মেরামত শেষ করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। এতে বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ থাকবে।
উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই কাতারএনার্জি প্রতি মাসে ফোর্স মেজর নোটিশ নবায়ন করছে। সর্বশেষ নভেম্বর পর্যন্ত এই নোটিশের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ থাকায় ভবিষ্যতে এই মেয়াদ আরও বাড়তে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কাতারএনার্জির ট্রেডিং শাখা কাতারএনার্জি ট্রেডিং বর্তমানে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ টন এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এই শাখাই প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ কোটি টনের এলএনজি পোর্টফোলিও পরিচালনা করে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে বলেছে, ‘তাদের হাতে যা-ই আসবে, সেটাই কিনতে হবে।’
এ বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছে রয়টার্স তাৎক্ষণিক মন্তব্য চাইলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ভেঞ্চার গ্লোবাল ও চেনিয়ের মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আর উডসাইড এলএনজি জানিয়েছে, বাজারের জল্পনা নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করে না।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জির সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে নির্মাণাধীন এলএনজি প্রকল্পগুলো থেকে মোট ২ কোটি ৫০ লাখ টন গ্যাস কেনার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবিক্রীত সক্ষমতা রয়েছে ভেঞ্চার গ্লোবালের হাতে—বছরে ১ কোটি টন। চেনিয়ের ও উডসাইড এনার্জির কাছে রয়েছে আরও ৬০ লাখ টন করে। সেম্পরার পোর্ট আর্থার এলএনজি প্রকল্প থেকে বিক্রির জন্য রয়েছে ৩০ লাখ টন।
এনার্জি গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান এমএসটি মার্কির প্রধান জ্বালানি গবেষক সল কেভোনিক বলেন, অন্য উৎপাদকদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি কেনার জন্য কাতারের বর্তমান তৎপরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, আগামী কয়েক বছর নিজস্ব এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে কাতার ঝুঁকি দেখছে।
তার মতে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে ও কাতারের এলএনজি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও প্রথমে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি হতে পারে। ফলে মেরামত শেষ করতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সময় লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কাতারের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির স্বাভাবিক সময়ে এলএনজি রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে যায়। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে কবে আবার স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এশিয়ার অনেক ক্রেতা ইতিমধ্যে কাতারি এলএনজির বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, বাজারের কিছু অংশগ্রহণকারী এমন পরিস্থিতিও যাচাই করছেন, যেখানে কাতার থেকে কোনো গ্যাসই পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ইরানের হামলা শুধু কাতারের উৎপাদন সক্ষমতাকেই চাপে ফেলেনি, একই সঙ্গে এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কাতারএনার্জির মার্কিন এলএনজি কেনার উদ্যোগ তাই সাময়িক ঘাটতি পূরণের চেয়ে বড় একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ

