সম্ভাবনা সত্ত্বেও কমছে কৃষিপণ্য রপ্তানি, নীতি সহায়তার তাগিদ
বিশ্বজুড়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাত (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) পণ্যের বাজার দ্রুত বড় হলেও সেই অনুপাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারছে না বাংলাদেশ। উল্টো গত কয়েক বছর ধরে দেশের এ খাতের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যহীনতা, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবের অভাব, বাণিজ্য চুক্তির ঘাটতি এবং চড়া উৎপাদন খরচের কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোর ১১তম আসরে আয়োজিত ‘এক্সপোর্ট অব অ্যাগ্রো-প্রসেসিং: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক টেকনিক্যাল সেশনে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
আইসিসিবিতে বাপা ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোর আয়োজিত ‘এক্সপোর্ট অব অ্যাগ্রো-প্রসেসিং: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক টেকনিক্যাল সেশন
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা ফেলো আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী। সেশনে উপস্থিত ছিলেন বাপার সভাপতি মাহবুব আনাম ও বাপার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি উজমা চৌধুরী।
বাপার সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছানের সঞ্চালনায় সেশনের প্যানেল আলোচক ছিলেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (এক্সপোর্ট) মিজানুর রহমান ও স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পারভেজ সাইফুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৮ সালে ২৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার প্রক্রিয়াজাত কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৭০০টির মতো প্রতিষ্ঠান রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। তবে বিশাল এই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বাজারের শেয়ার একেবারেই নগণ্য। বিশ্ব বাণিজ্য ১০০ টাকা ধরা হলে এতে ভিয়েতনামের শেয়ার যেখানে ৩ টাকা ৮৯ পয়সা, সেখানে বাংলাদেশের মাত্র ৫ পয়সা।
উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের এ খাতের রপ্তানি আয় তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাত থেকে ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার আয় হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও বাজারে সীমাবদ্ধ। মোট রপ্তানির প্রায় ৪৫ শতাংশই আসছে বিস্কুট ও স্ন্যাকসজাতীয় পণ্য থেকে। একসময় চিংড়ি রপ্তানি অন্যতম শক্তি হলেও তা দিন দিন কমছে। অন্যদিকে, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে বিশ্ববাজার দখল করছে। বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও গালফ অঞ্চলের দেশগুলোতে থমকে আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করছে প্রতিযোগী দেশগুলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ২২ ধরনের ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে। তবে অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং কার্যকর সংরক্ষণের অভাবে উচ্চ অপচয়ের কারণে কোনো নির্দিষ্ট কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারছে না। পাশাপাশি উৎপাদন পর্যায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জমি, বন্দরকেন্দ্রিক জটিলতা, অতিরিক্ত সেচ খরচ এবং ঋণের উচ্চ সুদের হার উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অর্থায়ন সংকটে ভুগছেন।
এ খাতকে পুনরুদ্ধার করতে একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরা হয় সেশনে। এর মধ্যে রয়েছে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি) নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে পণ্য উৎপাদন করা। এ ছাড়া বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি, সেচ খরচ হ্রাস এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ সময় প্যানেল আলোচক স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পারভেজ সাইফুল ইসলাম বলেন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আমরা ১ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছুঁয়েও আবার পিছিয়ে পড়েছি। এর মূল কারণ নীতিমালার বারবার পরিবর্তন। সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে আমরা বেশ ভালো করছিলাম, কিন্তু হঠাৎ করেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত ক্রেতাদের আমরা হারিয়ে ফেলি।
তিনি বলেন, একইভাবে আমাদের প্রচুর মসলা রপ্তানির সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় ‘রেডিয়েশন সুবিধা’ (পণ্য জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা) নেই। যে সামান্য সুবিধা রয়েছে, তাও প্রায়ই বন্ধ থাকে। ফলে ঠিকমতো রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল হালাল পণ্যের বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য হালাল পণ্য আর কেউ তৈরি করতে পারে না, অথচ নীতিগত দুর্বলতায় আমরা এই বিপুল সম্ভাবনার সুবিধা নিতে পারছি না। খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো দূর করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা দরকার। সমস্যাগুলোর সমাধান খুব সহজ হলেও বছরের পর বছর শুধু আলোচনাই হচ্ছে, বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের করপোরেট ফাইন্যান্স পরিচালক ও বাপার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি উজমা চৌধুরী বলেন, আমরা অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতকে এগিয়ে নিতে অনেক উদ্যোগ নিতে চাই, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় নীতিগত বা সমন্বিত কোনো সহায়তা পাই না। অন্যদিকে, কৃষকদের নতুন উদ্যোগে উৎসাহিত করার পরিবর্তে তারা উল্টো আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। একসময় আমরা পান বা মাছ প্রচুর রপ্তানি করতাম, অথচ এখন কেন পারছি না-তা নিয়ে গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্বমানের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্যে আমরা বাজার ধরে রাখতে পারছি না। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার সময়ে চাল রপ্তানির অনুমতির জন্য অনুনয়-বিনয় করেও আমরা রপ্তানি করতে পারিনি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশ উর্বরতায় সমৃদ্ধ, এক ইঞ্চি জমিও যেখানে অনাবাদি থাকে না, সেখানে পরিকল্পনার অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের নীতিবাচক মনোভাব থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান বলেন, বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। বৈশ্বিক এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। দেশে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও ছোট ছোট কোম্পানিগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকে থাকতে পারছে না। একটি অ্যাগ্রো-প্রসেসিং ব্যবসা শুরু করতেই দুই থেকে তিন ডজন লাইসেন্স নিতে হয়, যা মূলত হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে।
তিনি বলেন, একটি অনুমোদন পেতেই উদ্যোক্তাদের এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যা এ খাতের জন্য মারাত্মক বড় প্রতিবন্ধকতা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (এক্সপোর্ট) মিজানুর রহমান বলেন, আমরা বিশ্বের ১৩৮টি দেশে পণ্য রপ্তানি করলেও আমাদের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় (এথনিক) বাজার থেকে। মূলধারার বিশাল বৈশ্বিক বাজারের সুযোগ আমরা নিতে পারছি না। এ ছাড়া আমাদের রপ্তানির ৯০ শতাংশই যায় সাধারণ ভ্যারাইটি বা গ্রোসারি দোকানে, কারণ আন্তর্জাতিক ‘মডার্ন ট্রেড’ বা সুপারশপগুলোতে প্রবেশ করার মতো কমপ্লায়েন্স ও পণ্যের মানদণ্ড আমরা পূরণ করতে পারছি না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষার (টেস্টিং ফ্যাসিলিটি) সুযোগ নেই। বিদেশ থেকে ল্যাব টেস্ট করিয়ে আনতে আনতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেওয়া সময়সীমা পার হয়ে যায়। ফলে উন্নত স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে টিকে থাকা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও শুল্কমুক্ত সুবিধার অভাব স্পষ্ট।
এনএইচ/এমএএইচ/


