ডিউকস বাদ, পাকিস্তানের ক্রিকেটে ফিরছে কোকাবুরা বল
পাকিস্তানের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আবারও বল ব্যবহারে পরিবর্তন আসছে। দুই মৌসুম ডিউকস বল ব্যবহারের পর ২০২৬-২৭ মৌসুম থেকে কোকাবুরা বল ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। ব্যাটারদের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় তৈরি করা এবং বোলারদের মধ্যে ভারসাম্য ফেরানোর লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন।
নতুন মৌসুমে কায়েদ-ই আজম ট্রফি ও প্রেসিডেন্টস ট্রফিসহ পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোকাবুরা বল ব্যবহার করা হবে। শনিবার শুরু হচ্ছে এবারের প্রথম শ্রেণির মৌসুম। প্রথম রাউন্ডে মাঠে গড়াবে প্রেসিডেন্টস ট্রফি।
পিসিবির এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাট-বলের ভারসাম্য। গত দুই মৌসুমে ডিউকস বল ব্যবহারের ফলে ঘাস ও আর্দ্রতা থাকা উইকেটে পেসাররা বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন। এতে ম্যাচগুলো অনেক সময় অতিরিক্তভাবে বোলারদের দিকে ঝুঁকে গেছে।
ডিউকস বলের সিম তুলনামূলক শক্ত ও উঁচু হওয়ায় পেসাররা দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসে এবং পিচ থেকে বল ম্যুভ করানোর সুযোগ পান। ফলে নতুন বলের পাশাপাশি ম্যাচের পরের দিকেও পেসাররা উইকেট আদায় করতে পারেন। কোকাবুরার ক্ষেত্রে এই মুভমেন্ট তুলনামূলক দ্রুত কমে যায়।
পিসিবির ধারণা, ডিউকস বলের অতিরিক্ত সহায়তার কারণে ঘরোয়া ক্রিকেটে পেসারদের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগও কমে যাচ্ছিল। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বল যদি নিয়মিতভাবে বোলারদের বাড়তি সহায়তা করে, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে একই ধরনের সুবিধা না পেলে পেসারদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা
কোকাবুরা ফিরিয়ে আনার অন্যতম উদ্দেশ্য ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের মধ্যে ব্যবধান কমানো। পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটে ব্যবহৃত কোকাবুরার সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের বলের ধরন এক হলে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতিও বাস্তবসম্মত হবে বলে মনে করছে পিসিবি।
এবারের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বড় অংশ অনুষ্ঠিত হবে দেশের উত্তরাঞ্চলে- পেশোয়ার, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি ও অ্যাবোটাবাদে। এসব অঞ্চলের আবহাওয়া ও উইকেটে সাধারণত পেসাররা সহায়তা পেয়ে থাকেন। তাই ডিউকসের বদলে কুকাবুরা ব্যবহার করে ব্যাটার ও বোলারদের মধ্যে কিছুটা ভারসাম্য তৈরি করতে চায় পিসিবি।
ব্যাটারদের ক্রিজে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়াও এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য। ব্যাটাররা যদি তুলনামূলক কঠিন কিন্তু অতিরিক্ত বোলার-সহায়ক পরিবেশের বাইরে বেশি সময় ব্যাট করতে পারেন, তাহলে তাদের টেকনিক আরও ভালোভাবে তৈরি হবে বলে মনে করছে বোর্ড।
আর ব্যাটাররা সময় পেলে স্পিনারদের ভূমিকাও বাড়তে পারে। পেসারদের জন্য ডিউকস বলের অতিরিক্ত সহায়তা কমে গেলে ম্যাচের মাঝের ও শেষ পর্যায়ে স্পিনারদের হাতে উইকেট নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তান ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩-২৪ মৌসুম পর্যন্ত কোকাবুরা বল ব্যবহার করেছে। এর আগে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ মৌসুমে ডিউকস বল ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও ছিল।
তবে ২০২৪-২৫ মৌসুমে আবার ডিউকস ফিরিয়ে আনা হয়। সে সময় পাকিস্তানের ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছিল। একই সময় পাকিস্তান টেস্ট দলের লাল বলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন জেসন গিলেস্পি।
ডিউকস বল ব্যবহারের পাশাপাশি পাকিস্তান নিজেদের শক্তি হিসেবে পেস বোলিংকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেয়। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্টের সিরিজে ঘাসযুক্ত উইকেট তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজেই হেরে যায় পাকিস্তান। সেটি ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট হার এবং প্রথম টেস্ট সিরিজ হার।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যর্থতার পরও পাকিস্তান প্রথমে পেস-সহায়ক উইকেটের পথ থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি। কিন্তু পরের টেস্ট সিরিজে মুলতানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে হারের পর বড় পরিবর্তন আসে।
পাকিস্তান তখন ঘুরে দাঁড়াতে উইকেটের ধরন বদলে স্পিন-সহায়ক স্কয়ার টার্নার তৈরির দিকে যায়। এরপর দেশের মাটিতে টেস্ট ও সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও স্পিনারদের ব্যাপক সহায়তা করে এমন উইকেট তৈরির প্রবণতা দেখা যায়।
ফলে গত দুই বছরে পাকিস্তানের ক্রিকেটে পিচ ও বল নিয়ে একাধিকবার দর্শন বদলেছে। কখনো পেসারদের সহায়তা দিতে ঘাস ও আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করা হয়েছে, আবার কখনো স্পিনারদের আধিপত্য নিশ্চিত করতে টার্নিং উইকেট তৈরি করা হয়েছে।
কুকাবুরা বল ফিরিয়ে এনে পিসিবি যেন সেই চরম অবস্থানগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাট-বলের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে উত্তর পাকিস্তানের পেস-সহায়ক পরিবেশে ডিউকস বল ব্যবহার করলে ম্যাচ আরও বেশি বোলারনির্ভর হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই সিদ্ধান্তটি এসেছে।
ব্যাটারদের জন্য বেশি সময়, স্পিনারদের জন্য বাড়তি ভূমিকা এবং পেসারদের প্রকৃত দক্ষতা যাচাই- সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে চায় পিসিবি।
আইএইচএস/


