বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
রাজনীতি মূলত মতের প্রতিযোগিতা, মানুষের আস্থা অর্জনের শিল্প এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন মতের প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত বিদ্বেষে রূপ নেয়, বিতর্ক গালিগালাজে পরিণত হয়, ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হা...

রাজনীতি মূলত মতের প্রতিযোগিতা, মানুষের আস্থা অর্জনের শিল্প এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন মতের প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত বিদ্বেষে রূপ নেয়, বিতর্ক গালিগালাজে পরিণত হয়, ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা অনেকাংশেই এই সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। প্রশ্ন তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি আবার শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণতন্ত্র, সামাজিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ রাজনীতির ভাষা শেষ পর্যন্ত সমাজের ভাষাকেও প্রভাবিত করে। সংসদে যদি অসহিষ্ণুতা বাড়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি বিদ্বেষই রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে, তাহলে সেই প্রভাব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং নাগরিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিষ্টাচারের ঐতিহ্য একেবারে অনুপস্থিত ছিল—এমন বলা যাবে না। স্বাধীনতার আগে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি কিংবা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কেরও একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি ছিল। স্বাধীনতার পরও সংসদে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কঠোর সমালোচনা হয়েছে; কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে থেকেছে। প্রবীণ রাজনীতিকদের মধ্যে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সংসদে তীব্র বিতর্কের পরও ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য বজায় ছিল।

কিন্তু গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে নয়, বরং অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়েছে, সংলাপের পরিবর্তে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে এবং সমঝোতার রাজনীতি দুর্বল হয়েছে।

রাজনীতিতে শিষ্টাচারের অবক্ষয়ের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, নির্বাচনকে ঘিরে অবিশ্বাস, সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, দলীয় আনুগত্যের অতিরিক্ত গুরুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনমূলক প্রচারণা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। রাজনৈতিক বক্তব্যে তথ্যের চেয়ে আবেগ, যুক্তির চেয়ে স্লোগান এবং নীতির চেয়ে ব্যক্তি-আক্রমণ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই বাস্তবতার একটি বড় ক্ষতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংলাপের সংকোচন। গণতন্ত্রে মতভেদ স্বাভাবিক; কিন্তু মতভেদকে যদি শত্রুতায় রূপ দেওয়া হয়, তাহলে সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে যায়। তখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোও দলীয় অবস্থানের বাইরে আলোচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বের পরিণত গণতন্ত্রগুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা তীব্র বিতর্কে অংশ নেন, কিন্তু সংসদীয় আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। কানাডা, জার্মানি কিংবা নর্ডিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সমঝোতার সংস্কৃতিও সমানভাবে বিদ্যমান। নির্বাচন শেষ হলে প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রের শত্রু নয়, জনগণের আরেকটি প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশেও কি এমন সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব, তবে সেটি কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেরও প্রশ্ন।

শিষ্টাচার মানে দুর্বলতা নয়। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখানো মানে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসা নয়। বরং এটি আত্মবিশ্বাসী গণতন্ত্রের লক্ষণ। যে রাজনৈতিক দল নিজের যুক্তির ওপর আস্থা রাখে, সে প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে ভয় পায় না; বরং বিতর্কের মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়।

রাজনীতিতে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। নেতাদের বক্তব্যই কর্মীদের আচরণের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি শালীন ভাষা ব্যবহার করেন, প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখান এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলেন, তাহলে মাঠপর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতভাবে, নেতৃত্বের ভাষা যদি উত্তেজনাপূর্ণ হয়, তাহলে সেই উত্তেজনা দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

সংসদকে আবারও কার্যকর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। সংসদে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা যত বাড়বে, রাজপথে সংঘাতের প্রয়োজন তত কমবে। সংসদ যদি জাতীয় সমস্যার সমাধানের প্রধান মঞ্চ হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক উত্তেজনাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে উত্তেজনা নয়, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ, ভুয়া তথ্য এবং চরিত্রহননের সংস্কৃতি মোকাবিলায় নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল মতপ্রকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিতর্ক, মতবিনিময়, সহনশীলতা এবং ভিন্নমত সম্মান করার সংস্কৃতি শেখানো না গেলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবেশও খুব বেশি বদলাবে না। গণতন্ত্র কেবল একটি নির্বাচন পদ্ধতির নাম নয়; এটি একটি নাগরিক সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আলোচনা, মতামত ও জবাবদিহি থাকে, সেখানে শিষ্টাচারের চর্চাও তুলনামূলক বেশি হয়। অন্যদিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধকে সহজেই অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, যা পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে।

সুশীল সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোকেও রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশ তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দলীয় অবস্থানের বাইরে নীতিনির্ভর আলোচনা যত বাড়বে, রাজনীতির ভাষাও তত পরিণত হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।” রাজনীতিতে শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনার কাজও তেমনই কঠিন। কারণ এটি কেবল ভাষা পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনের প্রশ্ন। ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা থাকবে, মতাদর্শের লড়াই থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সেই লড়াই যেন ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বিভাজনের কারণ না হয়।

বাংলাদেশ এখন একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। অর্থনৈতিক রূপান্তর, তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ এবং বৈশ্বিক সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে রাজনীতিকেও নতুন ভাষা শিখতে হবে। সেই ভাষা হবে যুক্তির, তথ্যের, সহনশীলতার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার।

রাজনীতির ইতিহাস বলে, কোনো সমাজ চিরকাল সংঘাতের মধ্যে আটকে থাকে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতিও পরিবর্তিত হয়, যদি নেতৃত্ব সেই পরিবর্তনের সাহস দেখায় এবং নাগরিক সমাজ তা দাবি করে। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার প্রমাণ করেছে, তারা সংঘাতের চেয়ে স্থিতিশীলতা, বিদ্বেষের চেয়ে সহাবস্থান এবং প্রতিহিংসার চেয়ে উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

তাই প্রশ্নটি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?—এর উত্তর নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর। যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতার পরিবর্তে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়, যদি যুক্তিকে স্লোগানের ওপরে এবং প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে স্থান দেওয়া যায়, তবে সেই প্রত্যাবর্তন শুধু সম্ভবই নয়, অনিবার্যও। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; ভিন্নমতের মধ্যেও একটি সভ্য, সহনশীল এবং মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মধ্যেই তার সর্বোচ্চ সাফল্য নিহিত।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্টডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। | drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/opinion/article/1156575
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Business