যে দোকানে এখনো মেলে হারিয়ে যেতে বসা বেতের পণ্য

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বেত গাছ ও বেতশিল্প। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশে অবহেলায় জন্ম নিত বেতগাছ। সেই বেত দিয়ে তৈরি হতো নানা ধরনের প্রয়োজনীয় ও শৌখিন জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে মাদারীপুরে এখন আর সহজে বেত গাছের দেখা মেলে না। পাশাপাশি প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় একসময় গ...

দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বেত গাছ ও বেতশিল্প। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশে অবহেলায় জন্ম নিত বেতগাছ। সেই বেত দিয়ে তৈরি হতো নানা ধরনের প্রয়োজনীয় ও শৌখিন জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে মাদারীপুরে এখন আর সহজে বেত গাছের দেখা মেলে না। পাশাপাশি প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় একসময় গুরুত্ব পাওয়া বেতের তৈরি জিনিসপত্রও হারিয়ে যেতে বসেছে।

এমন পরিস্থিতিতেও মাদারীপুরের আওয়াল জমাদ্দার ও কারিগর বেল্লাল বেপারি ধরে রেখেছেন বেতশিল্পের ঐতিহ্য। বেল্লালের হাতে তৈরি বেতের নানা পণ্য আজও মাদারীপুরবাসীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের খোয়াজপুর এলাকার হেলাল উদ্দিন জমাদ্দারের ছেলে আওয়াল জমাদ্দার। তিনি মাদারীপুর শহরের এমএম হাফিজ মেমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ১৬ বছর ধরে বেতের তৈরি নানা জিনিসপত্র বিক্রি করে আসছেন। শিবচর উপজেলার মিরারকান্দি গ্রামের তৈয়ব আলী বেপারির ছেলে বেল্লাল বেপারি সেখানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন তার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বেতের পণ্য।

শৌখিন মানুষজন এখান থেকেই ঐতিহ্যবাহী বেতের তৈরি নানা জিনিসপত্র কিনে নেন। ‘সুইট হোম’ নামের প্রতিষ্ঠানটিই মাদারীপুরে বেতের জিনিস তৈরি ও বিক্রির একমাত্র মাধ্যম বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ কারণে জেলার মানুষ বেতের তৈরি পণ্য কিনতে এখানে ছুটে আসেন।

একসময় প্রতি মাসে তিন থেকে চার লাখ টাকার নানা জিনিসপত্র বিক্রি হলেও বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। অল্প দামে চাহিদামতো প্লাস্টিকের জিনিসপত্র পাওয়া যাওয়ায় দিন দিন বেতশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।


বেতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র/ছবি: জাগো নিউজ

এখানে বেতের তৈরি নানা ধরনের জিনিসপত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সোফাসেট, বেড সেট, ডিভান, বিভিন্ন ধরনের র‍্যাক, ট্রলি, টেবিল, চেয়ার, ফোল্ডিং চেয়ার, কর্নার, ইজি চেয়ার, ডাইনিং চেয়ার, বেবি কট, ম্যাগাজিন র‍্যাক, বিভিন্ন ধরনের দোলনা, বিভিন্ন ডিজাইনের শোপিস, চায়ের ট্রে ও ফলের ঝুড়ি। এ ছাড়া ক্রেতারা নিজেদের পছন্দের ডিজাইনের ছবি দেখিয়েও নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে নেন।

বেতের কারিগর বেল্লাল বেপারী বলেন, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে বেশি টাকা দিয়ে বেত কিনে আনতে হয়। পরে তা দিয়ে চাহিদামতো পণ্য তৈরি করা হয়। কিন্তু প্লাস্টিকের দাম কম হওয়ায় দিনে দিনে বেতের পণ্যের চাহিদা কমে যাচ্ছে। আগে কম দামে বেত কিনে আনতে পারলেও এখন কয়েক গুণ দাম বেড়েছে। তাই পণ্যের দামও বেশি রাখতে হচ্ছে। দাম অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করতে না পারায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘মালিকও প্রবাসে চলে গেছেন। তাই পুরো ব্যবসা আমাকে দেখতে হচ্ছে। মাদারীপুরে আমরাই একমাত্র এই বেতশিল্পকে ধরে রেখেছি। এটি হারিয়ে গেলে মাদারীপুর থেকে বেতশিল্পও হারিয়ে যাবে। তবে মাদারীপুরের একশ্রেণির শৌখিন মানুষ আছেন, যারা আমাদের নিয়মিত কাস্টমার। তারা আমাদের নিজস্ব শৈল্পিক কারুকাজ ও দৃষ্টিনন্দন নিপুণ হাতে তৈরি বেতের আসবাবপত্র ও ফার্নিচার বেশ পছন্দ করেন।’

বেতের পণ্য কিনতে আসা মাদারীপুর পুরানবাজারের মোসলেম হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে বেতের জিনিসপত্র খুব ভালো লাগে। তাই কিনতে এসেছি। তবে দাম একটু বেশি। তবুও শখের জন্য একটি সোফাসেট কিনব। মাদারীপুরের একমাত্র দোকান এটি। এই বেতশিল্পের ঐতিহ্যও অনেক।’

আরেক ক্রেতা মুন্নি আক্তার বলেন, ‘আমার বাসায় সব ফার্নিচারই বেতের। বেতের ফার্নিচারের মধ্যে একটা ঐতিহ্য আছে। একটা আভিজাত্যের ভাবও আছে। তাই ঘরের কোনো ফার্নিচার দরকার হলে মাদারীপুরের একমাত্র বেতের দোকান সুইট হোম থেকেই কিনে থাকি।’

মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘একসময় মাদারীপুরের আনাচে-কানাচে জন্ম নিত বেতগাছ। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশেই দেখা যেত বেতগাছ। কিন্তু আজ সেই বেতগাছ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তাই দিনে দিনে মাদারীপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বেতশিল্প।’

তিনি আরও বলেন, ‘একসময় বেতের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা ছিল ব্যাপক। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো বেতের তৈরি নানা পণ্য। সেই শিল্পের ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের মতো সস্তা পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে বেতশিল্পের চাহিদা কমে গেছে। এ ছাড়া কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং পণ্যের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় অনেক কারিগর তাদের পূর্বপুরুষদের এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এ কারণে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্পও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’

মাদারীপুরের উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা এবিএম বজলুর রহমান খান বলেন, এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/এসজেডএইচ/জেআইএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/country/news/1156609
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World