বিয়েতে নাচতে ডেকে দুই শিল্পীকে ধর্ষণ, সংস্কৃতি চর্চায় মন্দ হাওয়া

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
বিনোদনজগতের আলো ঝলমলে মঞ্চে দর্শকের চোখে থাকে শিল্পীর পরিবেশনা, পোশাক, নাচের ছন্দ আর হাততালির শব্দ। কিন্তু সেই মঞ্চের আড়ালে শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা, যাতায়াত ও কাজের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত- সেই প্রশ্নটি খুব কমই সামনে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সম্প্রতি বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশ...

বিনোদনজগতের আলো ঝলমলে মঞ্চে দর্শকের চোখে থাকে শিল্পীর পরিবেশনা, পোশাক, নাচের ছন্দ আর হাততালির শব্দ। কিন্তু সেই মঞ্চের আড়ালে শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা, যাতায়াত ও কাজের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত- সেই প্রশ্নটি খুব কমই সামনে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সম্প্রতি বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশনের কথা বলে দুই নারী নৃত্যশিল্পীকে ডেকে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের বিষয়টি সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

অতি সম্প্রতি সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে প্রান্তিক শিল্পীদের নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমার প্রদর্শনী, কনসার্ট স্থগিতের বিষয়গুলো সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য উদ্বেগের। এরমধ্যেই এবার এলো জেলাটির সরাইলে দুই নৃত্যশিল্পীর ধর্ষণের খবর।

জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশন করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুই নারী নৃত্যশিল্পী। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতারও করেছে সরাইল থানা পুলিশ। বিষয়টি সংস্কৃতিকর্মীদের মনে অস্বস্তি ও তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এর প্রভাবটাও নেতিবাচক হবে বলে মনে করছেন অনেকে।

শোবিজে অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী কিংবা নৃত্যশিল্পীদের কাজের ধরন অনেকটাই চুক্তিনির্ভর। বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে, করপোরেট আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে পারফর্ম করা শিল্পীদের অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেই কাজের প্রস্তাব আসে। পরিচিতি, পারিশ্রমিক ও অনুষ্ঠানের স্থান এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিল্পীরা কাজ গ্রহণ করেন।

কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই, যখন কাজের প্রস্তাব দেওয়া ব্যক্তি বা আয়োজকের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে আয়োজকের পরিচয়, অনুষ্ঠানের প্রকৃতি, সঠিক ভেন্যু এবং সেখানে কারা উপস্থিত থাকবেন- এসব বিষয় নিশ্চিত না করলে একজন শিল্পী অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারেন।

সোশ্যাল মিডিয়া কাজের প্লাটফর্ম হলেও যাচাই বাছাই জরুরি
সরাইলের ঘটনাটিতে পুলিশের ভাষ্য ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে যোগাযোগের পর বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশনের জন্য দুই নৃত্যশিল্পীকে ডাকা হয়েছিল। নির্ধারিত পারিশ্রমিকের কথা বলে তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাদের গন্তব্য পরিবর্তন করে নৌকায় তোলা এবং সেখানে তাদের ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু অপরাধের ভয়াবহতা নয়; বরং একজন শিল্পী কীভাবে একটি পেশাগত কাজের সূত্র ধরে এমন একটি অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন, সেটিও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

এই ঘটনাটি এটা বলছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের প্রস্তাব পেলেই সেগুলো যাচাই বাছাই না করে গ্রহণ করা উচিত নয়।

বর্তমানে শোবিজের অনেক শিল্পীর জন্য ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কাজ পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নতুন শিল্পীদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি কার্যকর। কোনো এজেন্সি বা পরিচিত প্রযোজকের মাধ্যমে নয়, সরাসরি ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কাজের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়।

এই ব্যবস্থার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ অনলাইনে একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে তথ্য দেন, তা সবসময় সত্য নাও হতে পারে।

তাই শিল্পীর নিরাপত্তার জন্য একটি ভেরিফিকেশন সংস্কৃতি তৈরি হওয়া জরুরি। কাজের প্রস্তাব এলেই শুধু পারিশ্রমিক ও অনুষ্ঠানস্থল নিয়ে আলোচনা না করে আয়োজকের পরিচয়, ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্য এবং অনুষ্ঠানের বিস্তারিত যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে অপরিচিত কোনো আয়োজকের সঙ্গে কাজ হলে একা না গিয়ে সহকারী, ম্যানেজার কিংবা বিশ্বস্ত কাউকে সঙ্গে রাখা এবং যাতায়াতের বিষয়টি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

নৃত্যশিল্পীরা কি শোবিজের তুলনামূলক অরক্ষিত কর্মী?
বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে নৃত্যশিল্পীদের অবদান দীর্ঘদিনের। টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সিনেমা, মিউজিক ভিডিও, স্টেজ শো ও ব্যক্তিগত আয়োজন- বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা কাজ করছেন। তবে সব নৃত্যশিল্পী সমান সাংগঠনিক সুরক্ষা পান না। অনেকেই ফ্রিল্যান্স বা প্রজেক্টভিত্তিক কাজ করেন। ফলে কাজের সময় নিরাপত্তা, যাতায়াত, পারিশ্রমিক, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট কাঠামো সবকিছু সবসময় পরিষ্কার থাকে না।

এ কারণেই এই শ্রেণির শিল্পীদের নিয়ে পেশাগত সংগঠন, ইভেন্ট আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। একজন শিল্পী মঞ্চে পারফর্ম করতে যাচ্ছেন মানেই তিনি আয়োজকের কাছে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় থাকবেন- এমন মানসিকতা বদলাতে হবে। শিল্পীর পারফরম্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার নিরাপত্তাও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।

‘অনুষ্ঠানে নাচ’ মানেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু শিল্পীর নয়
প্রায়ই কোনো নারী শিল্পী ঝুঁকির মুখে পড়লে তার পোশাক, পেশা, কোথায় গিয়েছিলেন কিংবা কার সঙ্গে গিয়েছিলেন- এসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অথচ কোনো পেশার কারণে কেউ সহিংসতার শিকার হওয়ার দায় তার ওপর বর্তায় না। এই ঘটনাটিও সেই জায়গা থেকে দেখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, তবে অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে দায় সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর।

একজন নৃত্যশিল্পী কোনো অনুষ্ঠানে নাচতে গেছেন মানে এটি তার পেশাগত কাজ। সেই পেশাগত সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে তার প্রতি কোনো ধরনের সহিংসতা বা যৌন নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সংস্কৃতিকর্মীদের দরকার নিরাপদ কাজের পরিবেশ
এই ঘটনা বিনোদন অঙ্গনের জন্য একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায় শিল্পীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরিতে আমরা কতটা প্রস্তুত?

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, নৃত্যদল ও শিল্পী সংগঠনগুলো চাইলে কিছু মৌলিক নিয়ম চালু করতে পারে। যেমন- কাজের লিখিত চুক্তি, আয়োজকের পরিচয় যাচাই, নির্দিষ্ট ভেন্যু নিশ্চিত করা, যাতায়াতের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্য রাখা।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রেও শিল্পীদের জন্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নতুন শিল্পীরা যেন শুধু কাজ পাওয়ার আশায় যেকোনো প্রস্তাবে রাজি না হন, সে বিষয়ে পেশাগত গাইডলাইন থাকা দরকার।

বিনোদনের আড়ালে যে বাস্তবতা
দর্শক যখন কোনো অনুষ্ঠানে একজন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনা দেখেন, তখন সাধারণত তার পেছনের গল্পটি জানেন না। একজন শিল্পী কত দূর থেকে এসেছেন, কীভাবে অনুষ্ঠানে পৌঁছেছেন, কে তাকে নিয়ে এসেছে কিংবা অনুষ্ঠান শেষে কীভাবে ফিরবেন- এসব প্রশ্ন দর্শকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে।

কিন্তু শিল্পীর নিরাপত্তার জন্য এগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

সরাইলের ঘটনাটি তাই শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়; এটি বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের অনানুষ্ঠানিক ও চুক্তিভিত্তিক কাজের পরিবেশ নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারী নৃত্যশিল্পীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সম্মান ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা এখন আর উপেক্ষা করার বিষয় নয়।

 

এলআইএ

Original Source
https://www.jagonews24.com/entertainment/news/1156617
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World