যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কি সত্যিই মাত্র ১৪ দিনের তেল অবশিষ্ট আছে?

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর মাত্র ১৪ দিনের মতো জ্বালানি তেল অবশিষ্ট আছে- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন এক চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। খুব সহজ এক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই দাবিটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই দাবিটি কি আসলেই সত্যি? আসুন সত্যিটা জেনে নিই... বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জরু...

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর মাত্র ১৪ দিনের মতো জ্বালানি তেল অবশিষ্ট আছে- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন এক চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। খুব সহজ এক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই দাবিটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই দাবিটি কি আসলেই সত্যি? আসুন সত্যিটা জেনে নিই...

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে (এসপিআর) প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ (২৮৬.৬ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। অন্যদিকে, দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ (২০.৭ মিলিয়ন) ব্যারেল তেলের ব্যবহার হয়।

মোট মজুতকে দৈনিক ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে ভাগ করলেই ফল দাঁড়ায় প্রায় ‘১৪ দিন’। গত ১৬ আগস্ট মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত তেল মজুত চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বছরের শুরুতে যেখানে এসপিআর-এ ৪১ কোটি ৫০ লাখ (৪১৫ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল মজুত ছিল, সেখানে গত মাসের শুরুতে সেই পরিমাণ কমে ৩০ কোটি ব্যারেলে নেমে আসে। আপাত দৃষ্টিতে গাণিতিক হিসাবটি সঠিক মনে হলেও বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সামাজিক মাধ্যমের এই পোস্টটি একটি বিষয়কে সঠিকভাবে তুলে ধরেছে- যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল মজুত ঐতিহাসিকভাবেই সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই হিসাব মার্কিন অর্থনীতির সার্বিক ঝুঁকিকে চরমভাবে বাড়িয়ে ও ভুলভাবে উপস্থাপন করছে।

কারণ হিসাবটিতে ভুলভাবে সরকারের জরুরি সুবিধার্থে সংরক্ষিত তেলকে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো তেল সরবরাহব্যবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। আসল বিষয়টি হলো, দুটি পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয় নির্দেশ করে।

এসপিআর-এ কেবল অপরিশোধিত খনিজ তেল (ক্রুড অয়েল) সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে, প্রতিদিন ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল ব্যবহারের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা হলো অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত মোট প্রক্রিয়াজাত তেল বা পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার। এর মধ্যে রয়েছে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত উপাদান।

বিষয়টি এমন এক পরিবারের মতো- যেখানে জরুরী মুহূর্তের জন্য রান্নাঘরের আলমারিতে রাখা ড্রাই ফুডকে পুরো পরিবারের খাদ্য তালিকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অথচ বাড়ির ফ্রিজ, সুপারমার্কেট বা প্রতিদিন বাসায় আসা টাটকা খাবারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল অর্থনীতি কেবল সরকারের এসপিআর-এর ওপর ভর করে চলে না। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ (১৩.৯ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে।

এছাড়া মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব গুদামে প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ (৪২৪.৫ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। তাদের রিফাইনারিগুলো প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ (১৭.৫ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল প্রক্রিয়া করে চালনা করছে।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করে। সংসংক্ষেপে, এসপিআর হলো ব্যাকআপ জরুরি ব্যবস্থা, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান জ্বালানি ট্যাংক নয়।

তবে বাস্তব উদ্বেগের বিষয় ভিন্ন জায়গায়। দেশের জ্বালানি সংকট দুই সপ্তাহের মধ্যে ঘনিয়ে না আসলেও সরকারি নিয়ন্ত্রণের জরুরি তেলের ভাণ্ডার যে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে, তা সত্য।

এসপিআরকে আমরা ইন্স্যুরেন্স পলিসির সঙ্গে তুলনা করতে পারি। মানুষ দৈনন্দিন খরচের জন্য পলিসির ওপর নির্ভর না করলেও কোনো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, অবরোধ, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বা বিশ্ব বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় ঘটলে এই সুরক্ষাই কাজে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেই সুরক্ষা নিশ্চিতের ভাণ্ডার এখন আগের চেয়ে অনেক ক্ষুদ্র। ২০২০ সালের শেষেও এসপিআর-এ প্রায় ৬৩ কোটি ৮০ লাখ (৬৩৮ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল সংরক্ষিত ছিল। তবে ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট নাগাদ তা কমে ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, যা ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন।

যুক্তরাষ্ট্রে দুটি ভিন্ন ধরনেরজরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইডেন ও ট্রাম্প- উভয় প্রশাসনের আমলেই এই রিজার্ভ থেকে ব্যাপক পরিমাণে তেল উত্তোলন করা হয়েছে।

১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল অবরোধের পর বৈশ্বিক কোনো সরবরাহ সংকটে যেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ধ্বংস না হয়ে যায়, সেই উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস আইন পাসের মাধ্যমে এই এসপিআর গঠন করে।

মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের ভূগর্ভস্থ বিশাল লবণের গুহায় বা সল্ট ক্যাভার্নে এই তেল জমা রাখা হয়, যাতে শোধনাগার ও পাইপলাইন নেটওয়ার্কে সহজে তেল পৌঁছানো যায়। এর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ কোটি ৪০ লাখ (৭১৪ মিলিয়ন) ব্যারেল।

বাইডেন প্রশাসনের সময় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাজার সামলাতে জো বাইডেন ছয় মাসে ১৮ কোটি ব্যারেল জরুরি তেল উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেন।

মার্কিন ট্রেজারির তথ্য মতে, এই পদক্ষেপে পেট্রোলের দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ১৭ থেকে ৪২ সেন্ট পর্যন্ত কমেছিল। তবে এতে রিজার্ভের বড় ক্ষতি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা সামলে ৪১ কোটি ৩০ লাখ (৪১৩ মিলিয়ন) ব্যারেলে উন্নীত করা হয়েছিল।

পরে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে নৌ-যোগাযোগ বিঘ্নিত হলে চরম সংকট তৈরি হয়। গত মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি মজুত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন তাদের রিজার্ভ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ (১৭২ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয়। ফলে ২০২৬ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ২৮ আগস্টের মধ্যে এসপিআর-এর মজুত ৪১ কোটি ৩৩ লাখ থেকে দ্রুত কমে ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।

অবশ্য বর্তমান এসপিআর তুলে নেওয়া নীতিটি সরাসরি বিক্রি না হয়ে একটি বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে চালিত হচ্ছে। বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো রিজার্ভের তেল ব্যবহার করলেও পরবর্তী সময়ে বাড়তি ‘প্রিমিয়াম’ তেলসহ আবার সরকারকে সেই ক্রুড অয়েল ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র রাত পেরোলেই তেলশূন্য হয়ে পড়বে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বাব আল-মান্দেব কিংবা হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হলে আমেরিকার বাজারে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম অবশ্যই বাড়বে।

বর্তমানে এই রিজার্ভের তলানি থেকে তেল ছাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনন্দিন শোধনাগারগুলোর চার শতাংশের কম চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে, যা বাজার কিছুটা স্থিতিশীল রাখলেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বিকল্প নয়। জরুরি ভাণ্ডারে মজুতের এই সংকট যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে অনেকাংশে দুর্বল করে দিয়েছে।

সূত্র: গালফ নিউজ

এসএএইচ

Original Source
https://www.jagonews24.com/international/news/1156641
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World