রিকশার হ্যান্ডেল ছেড়ে এখন নোবিপ্রবির শ্রেণিকক্ষে কাউসার

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে নিজের জীবনটা বদলে ফেলার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ মসৃণ ছিল না। সংসারের খরচ জোগাতে কখনো চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছে, কখনো কাঠমিস্ত্রির দোকানে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। আবার কখনো রিকশার প্যাডেলে পা রেখে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ময়মনসিংহের ছেলে কাউসারের জীবনের গল্প...

স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে নিজের জীবনটা বদলে ফেলার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ মসৃণ ছিল না। সংসারের খরচ জোগাতে কখনো চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছে, কখনো কাঠমিস্ত্রির দোকানে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। আবার কখনো রিকশার প্যাডেলে পা রেখে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।

ময়মনসিংহের ছেলে কাউসারের জীবনের গল্পটা এমনই। ছোট বয়স থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। যে বয়সে অন্যদের দিন কাটত খেলাধুলা আর বই-খাতা নিয়ে, সেই বয়সেই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কাজে নামতে হয়েছে তাকে। তবে জীবনের কঠিন বাস্তবতা তার পড়াশোনার স্বপ্নটাকে থামাতে পারেনি।

দিনের এক অংশ কেটেছে শ্রমে, অন্য অংশ পড়াশোনায়। কখনো কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে বই নিয়ে বসেছেন, আবার কখনো বই-খাতা সরিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কাজে নেমেছেন। এভাবেই একের পর এক বাধা পেরিয়ে এখন তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী।

কাউসারের ছোটোবেলা কেটেছে অভাবের মধ্যেই। পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে খুব অল্প বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, জীবনে কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে প্রথমে চায়ের দোকানে কাজ করেছেন। পরে একটু বেশি আয়ের আশায় কাজ নেন কাঠমিস্ত্রির দোকানে।

এরপর কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, আবার কখনো মাটি কেটেছেন। ধান কাটার মৌসুমে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন। বর্গাচাষও করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর চেষ্টা করেছেন।

কাজের ধরন নিয়ে কাউসারের কোনো বাছবিচার ছিল না। কারণ, তার কাছে কাজ মানে ছিল প্রয়োজন। পরিবার, নিজের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার প্রয়োজন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের দায়িত্বও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে জীবিকার জন্য হাতে তুলে নেন রিকশার হ্যান্ডেল।

কঠিন সব বাস্তবতার মধ্যেই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করেন কাউসার। সামনে ছিল ভর্তি কোচিংয়ের খরচ, নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যয় এবং পরিবারের আর্থিক চাপ। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে একসঙ্গে দুটি দায়িত্ব কাঁধে নেন তিনি-ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আর উপার্জন।

ঢাকায় এসে দিনের একটি অংশ কেটেছে রিকশার প্যাডেলে পা রেখে, আর অন্য সময়টা ভর্তি কোচিং ও পড়াশোনায়। রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করতেন, তা দিয়ে নিজের কোচিং ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতেন। নিজের স্বপ্নের জন্য শহরে এলেও পরিবারের প্রয়োজনের কথা ভুলে যাননি তিনি।

কখনো রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত শরীরে কোচিংয়ে গেছেন, আবার কখনো পড়াশোনার ফাঁকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ-দুটির মধ্যে সমন্বয় করেই এগোতে হয়েছে তাকে।

কাউসার বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েছি। একই সঙ্গে ভর্তি কোচিং করেছি। রিকশা চালিয়ে যে টাকা পেতাম, তা দিয়ে নিজের কোচিংয়ের খরচ চালিয়েছি, আবার বাড়িতেও টাকা দিয়েছি। তখন কষ্ট হতো, কিন্তু মনে হতো পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হলে আমাকে এভাবেই করতে হবে।’

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়টাও তাই অন্যদের মতো ছিল না কাউসারের। অনেকের কাছে কোচিং মানে শুধু ক্লাস আর পড়াশোনা, তার ছিল উপার্জনের চিন্তাও। তারপরও পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হারাননি।

কাউসার আরও বলেন, ‘জীবনে অনেক ধরনের কাজ করেছি। চায়ের দোকানে, কাঠমিস্ত্রির দোকানে, মাটি কাটা, ধান কাটা, রাজমিস্ত্রির কাজ, টিউশনি করা এবং রিকশা চালানো। কোনো কাজকেই ছোট মনে হয়নি। কারণ, আমার সামনে তখন একটাই লক্ষ্য ছিল, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় কাজ করার পর পড়তে বসলে শরীর খুব ক্লান্ত থাকত। তারপরও মনে হতো, আমাকে পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। সেই স্বপ্নটাই আমাকে বারবার কাজ করার শক্তি দিয়েছে।’

অবশেষে সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল আসে। মেধা ও পরিশ্রমের জোরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান কাউসার। ভর্তি হন ইইই বিভাগে। জীবনের কঠিন পথ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগ তার কাছে ছিল বড় এক অর্জন।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও জীবনের কঠিন অধ্যায় শেষ হয়নি। নোবিপ্রবিতে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরই কাউসার হারান তার জন্মদাত্রী মাকে। যে মা সন্তানের সাফল্যের দিনে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা, সেই মা তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই চলে যান। মাকে হারানোর শূন্যতা নিয়ে এখনো এগিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে।

কাউসার বলেন, ‘মাকে হারানোর কষ্টটা সবচেয়ে বেশি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন মনে হয়েছিল মা খুব খুশি হবেন। কিন্তু তাকে বেশিদিন সেই আনন্দটা দিতে পারিনি। এখন কোনো ভালো কিছু হলে মাকে বলতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয়, মা তো আর নেই।’

কাউসারের বাবা বেঁচে থাকলেও বর্তমানে কর্মক্ষম নন। ফলে পরিবারের দায়িত্বের একটি বড় অংশ এখনো তার কাঁধে। নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ - সবকিছু নিয়েই ভাবতে হয় তাকে।

কাউসার বলেন, ‘আমি চাই পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা অবস্থানে যেতে। নিজের পরিবারের দায়িত্ব নিতে। আমার মা যে স্বপ্ন দেখতেন, সেগুলো পূরণ করতে। আমি জানি, পথটা এখনো কঠিন। কিন্তু এতদূর যখন আসতে পেরেছি, সামনে আরও এগিয়ে যেতে চাই।’

কাউসারের সামনে এখন ক্যারিয়ার গড়ার লড়াই। একই সঙ্গে আছে পরিবারের দায়িত্ব। আছে মাকে হারানোর শূন্যতা, যা হয়ত সাফল্যের প্রতিটি ধাপেই তাকে মনে করিয়ে দেবে-এই পথটা তিনি একা পাড়ি দেননি, তার মায়ের স্বপ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।

কাউসারের হার না মানা গল্প শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প নয়। এটি অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন ধরে রাখার গল্প। এটি শ্রমকে ছোট না করে, প্রতিকূলতাকে ভয় না পেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। জীবন তাকে অনেকবার থামিয়ে দিতে চেয়েছে। কখনো অভাব দিয়ে, কখনো দায়িত্ব দিয়ে, প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্ট দিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই কাউসার নতুন করে পথ খুঁজেছেন।

কাউসারের পথচলা প্রমাণ করে স্বপ্ন পূরণের পথ যত কঠিনই হোক, চেষ্টা করলেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।

কেজে/এএসএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/campus/news/1156682
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World