কোরআনই তো যথেষ্ট, হাদিসের কী প্রয়োজন?
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘অতএব, তোমার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ ও বিবাদের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। অতঃপর তোমার দেওয়া ফয়সালার ব্যাপারে তাদের অন্তরে আর কোনো দ্বিধা বা সংকীর্ণতা থাকবে না এবং তারা তা পূর্ণ সন্তুষ্টির সাথে মেনে নেবে।’ (সুরা নিসা: ৬৫)
আজকের দিনে অনেকের মনেই এই প্রশ্নটি উঁকি দেয় যে, কোরআন যখন আমাদের কাছে আছেই, তখন হাদিস বা রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহর অনুসারী হওয়ার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি না। এই জটিল বিষয়টি বোঝার জন্য কোনো একাডেমিক বা জটিল পরিভাষার আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই; বরং অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও সাধারণ অনুধাবনের মাধ্যমে বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়।
প্রথমত, কোরআনের নিজস্ব যুক্তিই হাদিস অনুসরণের অপরিহার্যতার পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কোরআন গভীরভাবে উপলব্ধি করলে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দ্বিধা থাকে না যে, রাসুলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহ ও হাদিস কোরআন থেকে আলাদা করা অসম্ভব। এটি কোরআন অধ্যয়ন ও অনুশীলনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কোনো নতুন বিভ্রান্তি নয়। মদিনায় ইসলাম গ্রহণকারী একদল মানুষের মনেও এই একই সংশয় দেখা দিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো কথা বলতেন, তারা জানতে চাইত এটি কি তাঁর নিজের কথা, নাকি কোরআনের ওহি? তারা রাসুলুল্লাহর (সা.) ব্যক্তিগত মতামত ও ওহির মধ্যে পার্থক্য করতে চেয়েছিল।
কোরআনের মাদানি সুরাগুলোতে, বিশেষ করে সুরা নিসায় আল্লাহ তাআলা এই মানসিকতার চূড়ান্ত জবাব দিয়েছেন। সুরা নিসার ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজের কসম খেয়ে বলেছেন, মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত রাসুলুল্লাহকে (সা.) তাদের সমস্ত বিরোধের চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের সামনে নিজেদের মন থেকে সব ধরনের দ্বিধা সরিয়ে পুরোপুরি সমর্পণ না করবে, ততক্ষণ তারা কোনোভাবেই মুমিন হতে পারবে না।
কোরআনের অন্যান্য জায়গায় আল্লাহ সাধারণত তাঁর সৃষ্টির নামে শপথ করেন যেমন সময়, ডুমুর, জলপাই কিংবা তুর পাহাড়ের শপথ। কিন্তু এই বিশেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের নামে শপথ করেছেন এবং রাসুলুল্লাহকে (সা.) সম্বোধন করে বলেছেন, ‘তোমার রবের কসম!’ এটিই প্রমাণ করে রাসুলুল্লাহর (সা.) সিদ্ধান্ত ও তাঁর সুন্নাহর মর্যাদা আল্লাহর কাছে কতটা সুউচ্চ।
কোরআন কেবল আকাশ থেকে নেমে আসা শুষ্ক কোনো আইনের বই হিসেবে আসেনি, যা কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের মতো কেবল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কোরআন এসেছে একজন জীবন্ত রোল মডেল বা আদর্শ মানুষের মাধ্যমে। কোরআনের নীতি ও আদর্শকে কীভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে, তা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাই কোরআন ও রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনে এর প্রয়োগকে আলাদা করা যায় না।
মক্কার মুশরিকরা যখন রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে অলৌকিক নিদর্শন বা মোজেজা দাবি করেছিল, তখন আল্লাহ বলেছিলেন যে তাদের কাছে অবতীর্ণ এই কিতাবই কি তাদের জন্য মোজেজা হিসেবে যথেষ্ট নয়? এর অর্থ এই নয় যে কেবল বই থাকলেই চলবে আর রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রয়োজন নেই; বরং এর অর্থ হলো কোরআনের বাণী নিজেই এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী অলৌকিক প্রমাণ।
রাসুলুল্লাহর (সা.) নিজের ভাষা ও কোরআনের অলৌকিক ভাষার মধ্যে সুস্পষ্ট ফারাক ছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর যিনি মক্কাবাসীদের মাঝে বাস করেছেন, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি আর কোরআনের শৈলীর তফাত সবাই স্পষ্ট বুঝতে পারত। তাই সুন্নাহ ও হাদিসকে কোরআনের সত্যতার অন্যতম প্রামাণিক দলিল হিসেবেই দেখা উচিত।
তদুপরি, যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ও যে বিশ্বস্ত সাহাবিদের মাধ্যমে আমাদের কাছে কোরআন পৌঁছেছে, সেই একই নির্ভরযোগ্য সূত্রে হাদিসও সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত হয়েছে। ফলে সুন্নাহ বা হাদিসের ঐতিহাসিক প্রামাণিকতাকে অস্বীকার করতে গেলে কোরআনের সংকলন ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠে যায়, যে প্রশ্ন তোলা কোনো মুমিনের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে হাদিস অনুধাবনের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বা কনটেক্সট বোঝা অত্যন্ত জরুরি। কোনো হাদিসের গভীরতা ও মূল শিক্ষা না বুঝে কেবল অনুবাদ পড়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বিপজ্জনক। কোরআনের মতো দ্বীনের গভীর বিষয়গুলোকে বুঝতে হলে বুদ্ধি ও বিচারবিবেচনা প্রয়োগ করতে হয়।
আল্লাহ কোরআনকে স্মরণের জন্য সহজ করেছেন, কিন্তু দ্বীনের হেদায়েত ও শরিয়তের গভীরতা বুঝতে হলে রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবন ও সুন্নাহর আলোকেই তা বুঝতে হবে। সুন্নাহ ও রাসুলুল্লাহর (সা.) নবুয়তি মর্যাদাকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করে সর্বান্তকরণে তা মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই একজন মুমিন তার ইমানের পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। আল্লাহর শরিয়ত ও রাসুলের (সা.) সুন্নাহর সামনে নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্পণ করাই ইসলামি জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি।
সূত্র: নোমান আলী খানের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
ওএফএফ


