মাদকের ‘অঘোষিত হাট’ শেরপুর সীমান্ত
শেরপুর যেন মাদকের এক অঘোষিত হাট। ভারতঘেঁষা জেলার তিনটি উপজেলার সীমান্ত দিয়ে সুযোগ নিচ্ছেন কারবারিরা। কর্মহীন মানুষদের ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক বহনের কাজে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অপ্রতিরোধ্য এসব সিন্ডিকেট। শহর থেকে গ্রাম, এমনকি দুর্গম চর এলাকাগুলোতেও হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, রাবার বাগান, বারোমারি, খলচান্দা, নাকুগাঁও, বরুয়াজানী, রাধার বাঁধ, পানিহাটা, শালবাগানসহ অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে মাদক, কসমেটিকস, গরুসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য।
বিজিবি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ময়মনসিংহ সেক্টর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ এবং ১১৪ জন কারবারিকে আটক করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, সীমান্তের ওপার থেকে মাদক এনে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে মজুত করা হয়। এরপর ট্রাক, বাস, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলে করে তা জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
স্থানীয় সমাজকর্মী ছাইফুল ইসলাম মানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে বৃদ্ধ, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে এখনই সময় মাদকের লাগাম টেনে ধরার।’
ঝিনাইগাতীর বাসিন্দা রবিউল ইসলাম রোমান। তিনিও একজন সমাজকর্মী। রোমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঝিনাইগাতীর বাকাকুড়া এলাকায় চালের মতো মাদক মেলে। এখানকার যারা প্রভাবশালী তাদের ছত্রচ্ছায়ায় কারবারিরা ব্যবসা করছে। কারবারিদের সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী।’
মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার হয়েছেন রোমান। তিনি বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আমার ওপর মাদক কারবারিরা অতর্কিত হামলা করে। আমার সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলটিও ছিনিয়ে নিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত সাক্ষী-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কারবারিদের পক্ষে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় আমার মামলাটি আলোর মুখ দেখেনি।’
স্থানীয় শামীম আহমেদ বলেন, ‘কর্মহীন মানুষরা মাদক বহনে জড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে মাদকের ভয়াবহতা ও কুফল সমাজে ব্যাপকভাবে আলোচনা করতে হবে।’
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাদকের ব্যাপারে জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্স। সীমান্তে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে ও নির্মূলে বিজিবির সঙ্গে পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে।’
এ বিষয়ে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের লোকজনের কর্মসংস্থানের অভাব। তাই বেশিরভাগ লোকজন দারিদ্র্যতার মধ্যে বাস করছে। এই শ্রেণির লোকদের মাদক পরিবহনে ব্যবহার করছে কারবারিরা। এরসঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
জানতে চাইলে ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল নুরুল আজিম বায়েজীদ জানান, সীমান্ত দিয়ে মাদকসহ যেকোনো ধরনের চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কঠোর নজরদারি ও দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকবে।’
মো. নাঈম ইসলাম/এসআর/এএসএম




