কলকাতার মুসলিম কলোনিতে পানি নেই দেড় মাস ধরে, উচ্ছেদচেষ্টার অভিযোগ
কলকাতার উত্তরাঞ্চলীয় কাশীপুরের জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় দেড় মাস ধরে নিয়মিত পানি সরবরাহ নেই। কলোনির পাঁচটি সরকারি কল দিয়ে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হতো। বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ২৯ জুলাই থেকে পাঁচটি কলই শুকিয়ে আছে।
প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ এই কলোনিতে বসবাস করেন হাজার পাঁচেক মানুষ। তাদের অধিকাংশই মুসলিম এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য।
পানি না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা। অনেককে দূরের কল থেকে পানি সংগ্রহ করে ভ্যানযোগে বাড়িতে আনতে হচ্ছে। কেউ কেউ গঙ্গার পানি ব্যবহার করছেন।
পাইপলাইনের কাজের পরেই বন্ধ পানি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পানি সরবরাহ নিয়ে আগে কোনো সমস্যা ছিল না। এলাকার বাসিন্দারা স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের কাছেও এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননি।
এর মধ্যেই গত ২৬ থেকে ২৮ জুলাই এলাকায় পাইপলাইনের কাজ করে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন বা কেএমসি।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, কলোনির শুরু ও শেষ প্রান্তে দুটি জায়গায় রাস্তা খোঁড়া হয়েছিল। ২৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে পানি ফিরে আসবে বলে অপেক্ষা করলেও তা আর হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিউদ্দিন শেখ বলেন, রাতের অন্ধকারে পাইপলাইন বন্ধ করে রাস্তার কাজ করা হয়েছিল বলে ধারণা তাদের। এরপর থেকেই কলোনির পাঁচটি কলে আর পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎও বন্ধ হয়েছিল
পানির পাশাপাশি বিদ্যুৎ নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়েছিল বাসিন্দাদের। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
বাসিন্দা পিঙ্কি বিবির দাবি, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে—এমন সন্দেহে সংযোগ বন্ধ করা হয়েছিল। তবে তার ভাষ্য, কলোনির প্রতিটি বাড়ির আলাদা বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। প্রতিটি বাড়ির নামে আলাদা বিলও আসে।
স্থানীয়দের দাবি, এক সপ্তাহের বেশি সময় পর বিদ্যুৎসংযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জ্যোতিনগর কলোনির সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, বস্তি উন্নয়ন সমিতির প্রতিবাদের পর ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য প্রধান সড়কের সংযোগ বন্ধ করেছিল সিইএসসি। পরে সাতদিনের মধ্যে কোনো অবৈধ সংযোগ পাওয়া যায়নি নিশ্চিত হওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ ফের চালু করা হয়।
উচ্ছেদচেষ্টা চলছে, অভিযোগ বাসিন্দাদের
পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে উচ্ছেদ পরিকল্পনার অংশ বলে অভিযোগ করেছেন কলোনির বাসিন্দারা।
জ্যোতিনগর কলোনির সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, পানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা বন্ধ করে দিলে মানুষ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে—এমন পরিকল্পনা থাকতে পারে।
তার দাবি, কলোনিতে হিন্দু ও মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। মেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও রয়েছে।
কলোনির বাসিন্দা মরজিনা বেগম একটি কাচের কারখানায় কাজ করেন। তিনি বলেন, তাদের এই জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে।
তার ভাষ্য, তিনি এই কলোনিতেই জন্মেছেন। তার দাদাও বহু বছর আগে এখানে বসতি গড়েছিলেন। তারা সহজে জায়গা ছেড়ে যাবেন না।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জমি নিয়ে আইনি বিরোধ
জ্যোতিনগর কলোনির জমি নিয়ে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ রয়েছে।
আইনি নথি অনুযায়ী, প্রায় ৩ হাজার ৪৭৮ বর্গমিটার জমির ওপর কলোনিটি গড়ে উঠেছে। জমির মালিকানা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট, কলকাতার বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বন্দরের এস্টেট কর্মকর্তা কলোনির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের আদেশ দেন। ১৯৭১ সালের পাবলিক প্রিমিসেস (ইভিকশন অব আনঅথরাইজড অকুপ্যান্টস) আইনের আওতায় ওই আদেশ দেওয়া হয়।
আদেশে কলোনির বাসিন্দাদের বন্দর কর্তৃপক্ষের জমির ‘অননুমোদিত দখলদার’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশ প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে জমি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শুনানিতে বলা হয়েছিল, কলোনির কারণে ‘সাম্প্রদায়িক অশান্তির সম্ভাব্য হুমকি’ রয়েছে।
উচ্ছেদ ঠেকাতে আদালতে বাসিন্দারা
বাসিন্দারা গত ৯ জুন উচ্ছেদের আদেশের বিষয়টি জানতে পারেন বলে আইনি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর উচ্ছেদ ঠেকাতে তারা কলকাতার সিটি সিভিল কোর্টের প্রধান বিচারকের কাছে আবেদন করেন।
তবে ১৮ আগস্ট আদালত তাদের উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আবেদন নাকচ করে দেন। এরপর ১৯ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন বাসিন্দারা। হাইকোর্ট উচ্ছেদ কার্যক্রমের ওপর ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেন।
আদালতে নয়জন বাসিন্দা আবেদনকারী হিসেবে ছিলেন। তাদের আইনজীবীরা দাবি করেন, উচ্ছেদের আগে সংশ্লিষ্ট সব বাসিন্দাকে যথাযথভাবে নোটিশ দেওয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
১৯৭১ সালের আইনের ৪ নম্বর ধারায় উচ্ছেদের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আইনজীবীদের দাবি, এস্টেট কর্মকর্তার আদেশে এমন নোটিশ যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছিল কি না, তার উল্লেখ নেই।
বাসিন্দাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, সামিম আহমেদ, মো. নাসিরুল হক ও ইভি ব্যানার্জি। আইনজীবী সামিম আহমেদ বলেন, জমিটি যদি বন্দর কর্তৃপক্ষেরও হয়, তবু সেখানে বসবাসকারী মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
তার মতে, সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করা হলে রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ করতে পারে। তবে উচ্ছেদের ক্ষেত্রে মানুষের আবাসন ও মর্যাদার অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, ৬১ কোটি রুপির ক্ষতি
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৯০ সাল থেকে এই কলোনির কারণে তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬১ কোটি রুপির বেশি।
আইনি নথি অনুযায়ী, মাসে ১৯ লাখ রুপির বেশি ক্ষতি হচ্ছে। বছরে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি রুপির বেশি বলে দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া কলোনিটিকে ঘনবসতিপূর্ণ ও বসবাসের জন্য অনিরাপদ বলেও দাবি করা হয়েছে। দাহ্য পদার্থ ও অনিরাপদ বৈদ্যুতিক তারের উপস্থিতির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় কেন পানির সংকট?
পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ভৌগোলিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দারা। তাদের দাবি, পাইপলাইনের কাজ করা দুটি স্থানের মাঝের প্রায় ১৫০ মিটার এলাকায় পানি নেই। এই অংশের দুই পাশে থাকা কলগুলোতে পানি পাওয়া যাচ্ছে।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, ওই দুই জায়গায় রাস্তা খোঁড়ার স্থানই জ্যোতিনগর কলোনির সীমানার সঙ্গে মিলে যায়। কলোনির অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম।
স্থানীয়দের দাবি, এর ঠিক আগে ও পরে থাকা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার কলগুলোতে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
গঙ্গার ঘোলা পানি দিয়ে চলছে জীবন
পানি না থাকায় প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এক বাসিন্দা বলেন, পানি মৌলিক প্রয়োজন। কলোনিতে এত মানুষ থাকার পরও পানি না থাকায় আশপাশের এলাকার কল থেকে পানি আনতে হচ্ছে।
তবে সেসব কলের মালিকেরা নিজেদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় পানি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
বর্ষার সময়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এক তরুণী বাসন পরিষ্কার করার সময় গঙ্গা থেকে আনা ঘোলা পানি দেখিয়ে বলেন, এই পানি পরিষ্কার নয়। তবু অন্য কোনো উপায় না থাকায় তা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বয়স্ক এক নারী বলেন, গঙ্গায় এখন পানির স্তর অনেক বেশি। তাই সেখানে নেমে গোসল করা বা পানি সংগ্রহ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তার ওপর নদীর পানি ঘোলা ও পান করার অনুপযোগী।
আরেক নারী বলেন, শিশুদের ত্বকে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এরই মধ্যে কয়েকজনের ত্বকের সমস্যাও হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
পানি ও বিদ্যুৎ বন্ধ হওয়ার পরদিনই স্থানীয় বাসিন্দারা করপোরেশন কার্যালয়ে অভিযোগ করেছিলেন বলে জানান আলমগীর বিশ্বাস। তার দাবি, প্রথমে তাদের ফোন নম্বর নিয়ে বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়।
পরদিন হাতিবাগানের প্রধান করপোরেশন কার্যালয়েও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তবু কোনো সমাধান হয়নি।
স্থানীয় থানায়, কাউন্সিলরের কাছে এবং বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারির কাছেও তারা অভিযোগ করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা সরেজমিনে কলোনিতে এসে পরিস্থিতি দেখেননি বলে দাবি বাসিন্দাদের।
বাসিন্দারা স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে দেখা করলেও তিনি পানি সরবরাহ বন্ধের জন্য নিজে দায়ী নন বলে জানান। পিঙ্কি বিবির অভিযোগ, উল্টো বিধায়ক তাদের উচ্ছেদের হুমকি দিয়েছেন।
বিধায়ক যা বললেন
স্থানীয় বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারি অবশ্য পানি সংকটের দায় নিজের ওপর নিতে চাননি। তার বক্তব্য, জমিটি বন্দরের। পানি সরবরাহ করে কেএমসি। তাই এ বিষয়ে তার কী ভূমিকা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকায় রাজনৈতিক নেতাদের এ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত নয় বলেও জানান তিনি।
নিজের এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেবেন কি না, জানতে চাইলে বিধায়ক বলেন, এটি তার কাজ নয়।
তিনি আরও বলেন, বাসিন্দারা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তা চেয়েছেন। তাই তাদের সেই নেতাদের ওপর আস্থা রাখা উচিত।
পানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা
৯ সেপ্টেম্বর সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে জ্যোতিনগর কলোনিতে যান। তিনি বাসিন্দাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন এবং উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবাদ জানান।
দলটির উদ্যোগে প্রতি দুই থেকে তিনদিন পরপর কলোনিতে পানির ট্যাংকার পাঠানো হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো হয়নি।
সূত্র: অল্ট নিউজ
কেএএ/

