পানি বেড়ে আগ্রাসী পদ্মা, একের পর এক বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর
একদিন যেখানে ছিল কোলাহল, সেখানে এখন শুধুই পানি। শিশুরা যে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে, সেই বিদ্যালয়ের এখন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কোথাও ভাঙনের মুখে বসতঘর, কোথাও মসজিদ, কোথাও ফসলি জমি। পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর চরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙনের এই ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পদ্মার পানি বাড়ার পাশাপাশি তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। এরই মধ্যে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয় পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পাঠদান বন্ধ রয়েছে আরেকটি বিদ্যালয়ে। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে শতাধিক বসতবাড়ি ও কয়েকটি মসজিদও নদীতে হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে পানি বাড়ায় পবা উপজেলার চর খিদিরপুর, খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা। ঘরবাড়ি ও উঠানে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না, চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কোথাও গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব। এর সঙ্গে বাড়ছে সাপের উপদ্রবও।
‘পানি বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পবা উপজেলার চরাঞ্চলে। উপজেলার চর খিদিরপুরের ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত মিডিল চরে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উপচে পড়া পানিতে দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। বেশিরভাগ বাড়ির উঠান ও ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না ও বসবাস প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতর পানি, বাইরে পানি—এর মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন চরবাসী’
পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে উঠেছে যে, শেষ সম্বল গরু-ছাগল, ধান, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নৌকায় করে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। পদ্মার পানি ও ভাঙনের দ্বিমুখী চাপে চরাঞ্চলের বহু পরিবার এখন ঘর হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রতিদিনই পানি বাড়ছে পদ্মায়
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় নগরের বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ৩০ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।

এর আগের দিন শুক্রবার সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২০ মিটার। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ছিল ১৭ দশমিক ১২ মিটার। আর বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ১৬ দশমিক ৯৫ মিটার।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পদ্মার পানি বেড়েছে প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার। পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতায় নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উজানে গঙ্গার পানি বৃদ্ধি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে পদ্মার পানি বাড়ছে। এরইমধ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও বিভিন্ন চরে পানি প্রবেশ করেছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কোথাও ভাঙনও তীব্র হয়ে উঠেছে।
তীব্র হচ্ছে পদ্মার ভাঙন
পদ্মার ভাঙনের ভয়াবহতার সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা গেছে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে। সেখানে পলাশি ফতেপুর, আতারপাড়া ও চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের কবলে পড়ে। বিদ্যালয়গুলোর মালামাল নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু নদীভাঙনের গতি এতটাই দ্রুত ছিল যে, সব মালামাল সরিয়ে নেওয়ার আগেই একটি বিদ্যালয় পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
‘পদ্মার ভাঙনের ভয়াবহতার সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা গেছে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে। সেখানে পলাশি ফতেপুর, আতারপাড়া ও চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের কবলে পড়ে। বিদ্যালয়গুলোর মালামাল নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু নদীভাঙনের গতি এতটাই দ্রুত ছিল যে, সব মালামাল সরিয়ে নেওয়ার আগেই একটি বিদ্যালয় পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়’
আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাঙতে ভাঙতে শেষ পর্যন্ত নদীগর্ভে চলে গেল স্কুলটি। চরের মধ্যে একদিন স্কুল ভালো দেখে গেলাম, পরদিন এসে দেখি স্কুল নেই। মালামাল সরিয়ে নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত স্কুলটিও বিলীন হয়ে গেল।’
বিদ্যালয়টিতে ৮৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক ছিলেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে বিদ্যালয়ের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছিল। কিন্তু গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে সেই কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যালয়টি পুরোপুরি নদীগর্ভে চলে যায়।
চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, ‘বিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। এ কারণে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ে ৯১ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক রয়েছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি চরে এক হাজার ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব চরে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। চকরাজাপুর, কালিদাসখালী, লক্ষ্মীনগর, দাদপুর, নিচ পলাশি, পলাশি ফতেপুর, আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে।

চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ভাঙন হয়েছে। প্রায় ১০০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কয়েকটি মসজিদও নদীতে হারিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।’
চৌমাদিয়া চরের বাসিন্দা সোলেমান মোল্লা বলেন, ‘পদ্মায় পানি ক্রমাগত বাড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও বাড়ছে। গবাদিপশু নিয়ে চরের মানুষ খুব বিপাকে পড়েছেন। অনেক বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে।’
নৌকায় করে এলাকা ছাড়ছেন বাসিন্দারা
পানি বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পবা উপজেলার চরাঞ্চলে। উপজেলার চর খিদিরপুরের ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত মিডিল চরে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উপচে পড়া পানিতে দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। বেশিরভাগ বাড়ির উঠান ও ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না ও বসবাস প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতর পানি, বাইরে পানি—এর মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন চরবাসী।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে গবাদিপশু নিয়ে। পানিতে চরের অনেক জায়গা ডুবে যাওয়ায় গরু-ছাগলের খাবার সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বাড়ছে সাপের উপদ্রব। ফলে পরিবার ও গবাদিপশু—দুই দিকের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন মানুষ।
অনেকে বাধ্য হয়ে গরু-ছাগল, ধান, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় মালামাল নৌকায় তুলে শহরের ঘাটের দিকে যাচ্ছেন। নিরাপদ জায়গায় কিছুদিন থাকার আশায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ছেন তারা।
চর খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকার নিচু বসতভিটা ও চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর তালাইমারীর মাঠও পানিতে। শুধু চরাঞ্চল নয়, পানি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে রাজশাহী নগরীর কিছু নিচু এলাকাতেও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মার পাশাপাশি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বড়াল নদীর পানিও বাড়ছে। এতে চারঘাট স্লুইসগেটসংলগ্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পানির চাপে স্লুইসগেটের এক পাশে সামান্য ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনস্থলের পাশেই একটি মন্দির থাকায় পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
আরাজি সাদিপুর ও মিয়াপুর হঠাৎপাড়া গ্রামের কয়েকটি রাস্তায় পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্কুলশিক্ষার্থীরা। পানি মাড়িয়ে কিংবা বিকল্প পথ ব্যবহার করে তাদের চলাচল করতে হচ্ছে।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘নদীর পানি বৃদ্ধি ও স্লুইসগেট এলাকার পরিস্থিতির বিষয়ে প্রশাসন অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ত্রাণ, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের উদ্যোগ পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। দুর্গত চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে খাবার ও ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য চরাঞ্চলসহ তিনটি স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। গবাদিপশু রাখার জন্য ভ্রাম্যমাণ আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রায় ১০ ফুট উঁচু দুটি বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, ‘নদীভাঙনের বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত প্রতিদিনই পানি পরিমাপ করছি। পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। এখানে বন্যা হওয়ার ঝুঁকি কম। তবে কিছু কিছু স্থান প্লাবিত হয়েছে, যেটি প্রতিবছরই হয়ে থাকে। তবে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানাই।’
এসআর/এএসএম








