হুথিদের সামরিক শক্তি কতটা, কেন তারা এত বড় হুমকি?
আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় রয়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। তাদের এই অগ্রগতি সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, হুথি মূলত কারা? তারা ঠিক কতটা শক্তিশালী? আসুন, এই প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজা যাক...
ইতিহাস
২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানী সানা দখলের নবম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে হুথি সৈন্যরা/ ছবি: এএফপি
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা একসময় মূলত স্থানীয় গেরিলা বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ, ইরানের সহায়তা এবং নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার কারণে তারা এখন এমন এক সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ-অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সর্বশেষ লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অগ্রগতি এবং কৌশলগত মোখা বন্দর ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনায় তাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা-সহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সামনের সারিতে সংঘাত তুলনামূলকভাবে স্থবির থাকলেও ২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক যুদ্ধ নতুন করে ইয়েমেনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এখন লোহিত সাগরের দিকে হুথিদের অগ্রগতি তাদের শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম আঞ্চলিক সামরিক শক্তি হিসেবে সামনে এনেছে।
ক্ষেপণাস্ত্রই প্রধান শক্তি
হুথিদের সামরিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর একটি হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার। তাদের হাতে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণেও হুথিদের ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে ইয়েমেন সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা হুথিদের ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সুযোগ দিয়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অতীতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। রিয়াদের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যেও হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছিল গোষ্ঠীটি।
তবে হুথিদের হাতে কতটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই। বিভিন্ন মডেল ও উৎসের অস্ত্র তাদের ভাণ্ডারে থাকায় সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তারা এসব অস্ত্র নিয়মিতভাবে ব্যবহার এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সংযোজন বা উৎপাদন করার সক্ষমতা তৈরি করেছে।
ড্রোনে বড় পরিবর্তন
হুথিদের সামরিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ড্রোন। একসময় অপেক্ষাকৃত সীমিত সক্ষমতার এই অস্ত্র এখন তাদের যুদ্ধকৌশলের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাদের হাতে স্বল্পপাল্লার ড্রোন থেকে শুরু করে দীর্ঘপাল্লার একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন বা ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ইউএভি’ রয়েছে।
কাসেফ ও সাম্মাদ পরিবারের ড্রোনসহ ইরানি নকশার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যবস্থা হুথিরা ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে তুলনামূলক সহজ প্রযুক্তির ড্রোন তৈরি বা সংযোজনের সক্ষমতাও গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ড্রোনের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এখানেই হুথিদের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। অত্যাধুনিক একটি অস্ত্র পুরোপুরি তৈরি করার সক্ষমতা না থাকলেও তারা বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও নকশা ব্যবহার করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র তৈরি বা সংযোজন করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট কারখানা বা সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা চালিয়ে তাদের পুরো ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন।
সমুদ্রেও ভয়ংকর সক্ষমতা
হুথিদের সামরিক শক্তিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তাদের নৌ-আক্রমণ সক্ষমতা। জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনবোট ও অন্যান্য নৌ-অস্ত্র ব্যবহার করে তারা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
২০২৩ সালের শেষদিক থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলার ধারাবাহিকতায় হুথিরা প্রমাণ করেছে যে তাদের সক্ষমতা শুধু স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়। তারা বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে এবং একটি ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার থেকে যোদ্ধারা জাহাজে নেমে সেটি দখলও করেছিল।
২০২৬ সালে পেরিম দ্বীপের মতো কৌশলগত অবস্থান তাদের হাতে আসায় এই সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পেরিম দ্বীপ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছেই অবস্থিত। ফলে হুথিরা সেখানে অবস্থান শক্ত করতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি থেকে তুলনামূলক কম দূরত্বে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও নৌ-অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।
ইরানের ভূমিকা কতটা?
হুথিদের সামরিক শক্তি গড়ে ওঠার পেছনে ইরানের ভূমিকা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা রয়েছে। ইরান সরাসরি হুথিদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করার অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিভিন্ন সূত্র ও গবেষণায় অস্ত্র, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও সামরিক পরামর্শের সহায়তার কথা উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক হুথি অভিযানে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কর্মকর্তাদের পরামর্শ এবং উন্নত অস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহের ভূমিকার কথা আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে হুথিদের পুরো সামরিক সক্ষমতাকে শুধু ইরানের অস্ত্র সরবরাহ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। এক দশকের যুদ্ধ তাদের নিজস্ব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, অস্ত্র পরিবর্তন, স্থানীয় উৎপাদন এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পরিচালনার দক্ষতা বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের ড্রোন সক্ষমতায় ইরানি প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের নিজস্ব অপারেশনাল অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু অস্ত্র নয়, যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও শক্তি
হুথিদের বড় সুবিধা তাদের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে লড়াই তাদেরকে আকাশ হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর কৌশল শিখিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার পরও তাদের অস্ত্র তৈরির ও হামলা চালানোর সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, হুথিরা বিভিন্ন ধরনের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অ্যান্টি-শিপ অস্ত্র ধরে রেখেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সক্ষমতাও তৈরি করছে।
এ কারণেই হুথিদের ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে সামরিক শক্তি বিচার করা কঠিন। একটি বড় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মতো তাদের বিমানবাহিনী বা অত্যাধুনিক নৌবহর নেই। কিন্তু তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরক নৌযান ব্যবহার করে তারা অত্যন্ত ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজ, তেল স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় শক্তি- ভৌগোলিক অবস্থান
হুথিদের সামরিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় গুণ সম্ভবত তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের অবস্থান। বাব আল-মান্দাব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। এই পথ দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে হুথিরা এই অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করতে পারলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণও এখানেই।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের কাছে ইরানের মতো বিপুল সামরিক অবকাঠামো নেই এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের যে ধরনের দীর্ঘদিনের সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তার সমতুল্য শক্তিও তাদের নেই। কিন্তু লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের কাছে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে পারলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
তাহলে হুথিরা কতটা শক্তিশালী?
সব মিলিয়ে হুথিদেরকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তাদের কাছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, বড় নৌবহর বা ব্যাপক সাঁজোয়া বাহিনী নেই। কিন্তু ক্ষুদ্র ও তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র দিয়ে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব সৃষ্টি করার সক্ষমতা তাদের সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, দীর্ঘপাল্লার ড্রোন, অ্যান্টি-শিপ অস্ত্র, বিস্ফোরক নৌযান, স্থানীয় অস্ত্র সংযোজনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা- সব মিলিয়ে হুথিরা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। আর এখন পেরিম দ্বীপ ও মোখার মতো কৌশলগত অবস্থানে তাদের অগ্রগতি এই শক্তিকে আরও বড় আঞ্চলিক প্রভাবের সুযোগ করে দিচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য ন্যাশনাল, আল-জাজিরা
এসএএইচ


