ফকল্যান্ডসের পর আয়ারল্যান্ড, ট্রাম্পের মন্তব্যে অস্বস্তিতে যুক্তরাজ্য
আয়ারল্যান্ডের বিভক্তি নিয়ে পুরোনো বিতর্কে যেন আবারও নতুন হাওয়া লাগল। দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটন সাধারণত সতর্ক থাকে। তবে এবার সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে কথা বললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এক হয়ে যাওয়া ‘দারুণ’ হবে। তার ধারণা, এই একীভূতকরণ একদিন ঘটবেই, তাই এখনই হলে আরও ভালো।
গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ডাবলিনে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। এরপরই তার মন্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে যুক্তরাজ্য সরকার ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্তরাজ্যপন্থি নেতারা।
ট্রাম্প বলেন, তিনি কোনো সমস্যা তৈরি করতে চান না। তবে, তিনি একীভূত আয়ারল্যান্ড দেখতে চান। উত্তর আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হলে সেটি ‘দারুণ’ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, শেষ পর্যন্ত এই একীভূতকরণ ঘটবেই। তাই এখনই হলে আরও ভালো। তবে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যেরও বলার মতো বিষয় রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে, ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, একীভূত আয়ারল্যান্ড নিয়ে এখনই গণভোট আয়োজনের মতো প্রয়োজনীয় জনসমর্থন নেই বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন।
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তিতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান পরিবর্তনের জন্য গণভোটের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে, সেই ভোট আয়োজনের আগে প্রয়োজনীয় জনসমর্থন তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) নেতা গ্যাভিন রবিনসনও ট্রাম্পের মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।
তিনি বলেছেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ লন্ডন, ডাবলিন বা ওয়াশিংটনের কোনো মন্তব্যে নির্ধারিত হবে না। এ সিদ্ধান্ত নেবেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণই। তার ভাষ্য, জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উত্তর আয়ারল্যান্ড এখন যুক্তরাজ্যের অংশ।
এর আগে, ফকল্যান্ডস ইস্যুতেও ট্রাম্পের মন্তব্যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন সামনে এসেছিল। সম্প্রতি জিবি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, আর্জেন্টিনা আবার ফকল্যান্ডস দখলের চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের পাশে থাকবে কি না। এর সরাসরি উত্তর না দিয়ে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে একসময় ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বলা হতো। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। তবে, এবার ফকল্যান্ডস নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে সেই পুরোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের টানাপোড়েনই নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে, যুক্তরাজ্য ফকল্যান্ডসের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কির্স্টি ম্যাকনিল গত ৮ সেপ্টেম্বর বলেছেন, ফকল্যান্ডসের ওপর ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ফকল্যান্ডসের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় যুক্তরাজ্যের অবস্থানও অটল বলে জানিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ফকল্যান্ডস নিয়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও তার অবস্থান আরও জোরালো করেছেন। ফকল্যান্ডসকে আর্জেন্টিনার ভূখণ্ড দাবি করে তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মিলেই বলেন, বিশ্বে পরিবর্তনের এমন ‘হাওয়া’ বইছে, যা আর্জেন্টিনার দাবির পক্ষে যাচ্ছে।
এদিকে, আয়ারল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতি পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য সেই অবস্থান থেকে আলাদা হলেও এরই মধ্যে ডাবলিনে তার সফর ঘিরে বিক্ষোভ হয়েছে। হাজারো মানুষ মিছিল করে তার বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদ করেন। বিশেষ করে ইরান ও গাজা নিয়ে তার নীতির সমালোচনা করেন বিক্ষোভকারীরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এমডিআরএইচ/




