যত হাসি তত কান্না বলেছেন রামসন্না, কে ছিলেন এই ‘রামসন্না’?
‘যত হাসি তত কান্না, বলে গেছে রাম সন্না’ বাংলা ভাষায় বহুল পরিচিত একটি প্রবাদ। কারো জীবনে যখন অতিরিক্ত আনন্দ আসে, তখন বয়স্করা অনেক সময় সতর্ক করে বলেন, ‘বেশি হাসতে নেই, যত হাসি তত কান্না।’ কথাটির মধ্যে রয়েছে জীবনের সুখ-দুঃখের ওঠানামার একটি সহজ দর্শন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রাম সন্না আসলে কে? সত্যিই কি এমন কোনো ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এই কথা বলে গিয়েছিলেন?
রাম সন্নাকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত পরিচয় হলো তিনি ছিলেন রামশংকর শর্মা। তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। রামশংকর শর্মা নামে এমন একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন এবং তার জীবনী ‘আত্মচরিত’ নামে একটি বই লিখেছিলেন এমন একটি কাহিনি বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় গোয়েন্দা উপন্যাসে পাওয়া যায়। কিন্তু স্বাধীন ঐতিহাসিক সূত্রে এই ব্যক্তির জীবন ও প্রবাদটির সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ সহজে পাওয়া যায় না।
রাম সন্নাকে নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত গল্পটি পাওয়া যায় কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের কর্নেল সিরিজের ‘বলে গেছেন রাম সন্না’ বইয়ে। সেখানে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার রাম সন্নার পরিচয় হিসেবে ‘রামশংকর শর্মা’ নামটি উল্লেখ করেন। বইয়ের কাহিনি অনুযায়ী, রামশংকর অল্প বয়সে বাড়ি ছেড়ে জাহাজে সি-বয়ের চাকরি নেন। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। জীবনের শেষদিকে নদিয়ার একটি গ্রামে ফিরে এসে নিজের পৈতৃক ভিটায় বড় বাড়ি তৈরি করেন।
সেই কাহিনিতে আরও বলা হয়েছে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় রামশংকর গোপনে বিদ্রোহীদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এ কারণে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে তার বিচার হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। ফাঁসির সেলে থাকার সময় তিনি নিজের জীবনী ‘আত্মচরিত’ লিখেছিলেন বলেও উপন্যাসে উল্লেখ রয়েছে। পরে তার ভাই শ্যামশংকর সরকারের অনুমতি নিয়ে বইটি প্রকাশ করেন।
শুনতে অনেকটা ইতিহাসের গল্পের মতো হলেও সমস্যা হলো, এই তথ্যগুলোর বড় অংশই পাওয়া যায় কথাসাহিত্যের ভেতরে। ফলে উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনাগুলোকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। এমনকি রাম সন্নার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে, সেখানেও এই তথ্যের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তাহলে প্রবাদটি এলো কীভাবে?
এখানেও নিশ্চিত ইতিহাসের বদলে লোকমুখে প্রচলিত ভাষার বিবর্তনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। বাংলার লোকজ প্রবাদে কোনো একটি কথা অনেক সময় নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে প্রচলিত হয়ে যায়। সেই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় সময়ের সঙ্গে অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। ‘রাম সন্না’ও তেমন কোনো লোকচরিত্র বা প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে থাকতে পারেন।
প্রবাদটির মূল বক্তব্য অবশ্য বেশ পরিষ্কার। জীবনে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি দুঃখও আছে। অতিরিক্ত আনন্দের পর হতাশা আসতে পারে, সুখের সময়ের পর কঠিন সময়ও আসতে পারে। তাই কথাটি মূলত মানুষকে জীবনের উত্থান-পতন সম্পর্কে সচেতন করে। অর্থাৎ ‘যত হাসি তত কান্না’ কথাটি আক্ষরিক অর্থে যতবার হাসা হবে, ঠিক ততবার কাঁদতে হবে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক বা গাণিতিক নিয়ম নয়। এটি জীবনের ভারসাম্য ও অনিশ্চয়তার একটি রূপক ব্যাখ্যা।
বাংলা সাহিত্যেও এই প্রবাদের ব্যবহার বেশ পুরোনো ও পরিচিত। হুমায়ূন আহমেদের ‘অচিনপুর’ উপন্যাসে ‘যত হাসি তত কান্না, কহে গেল রাম সন্না’ এই ছন্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রবাদটি শুধু মুখে মুখে নয়, বাংলা কথাসাহিত্যের মধ্যেও জায়গা করে নিয়েছে।
আহসান হাবীবও তার একটি বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘যত হাসি তত কান্না বলে গেছে রাম সন্না’। বইটির নামের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, রাম সন্না নামটি বাংলা সংস্কৃতিতে কতটা পরিচিত একটি প্রবাদপ্রতিম চরিত্রে পরিণত হয়েছে। তবে তিনিও রাম সন্নার নিশ্চিত ঐতিহাসিক জীবনী তুলে ধরেছেন এমন প্রমাণ নেই।
আরেকটি মজার বিষয় হলো, ‘রাম সন্না’ নামটি নিয়েও ভিন্নতা দেখা যায়। কোথাও ‘রাম সন্না’, কোথাও ‘রাম সন্যা’, আবার কোথাও রামশংকর শর্মার সঙ্গে নামটি যুক্ত করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মুখে মুখে চলতে চলতে প্রবাদের শব্দ ও চরিত্রের পরিচয়েও পরিবর্তন এসেছে।
তবে এই প্রবাদের জনপ্রিয়তার আসল কারণ সম্ভবত রাম সন্নার পরিচয় নয়, বরং কথাটির সহজ জীবনদর্শন। মানুষ আনন্দের সময় যেমন ভবিষ্যৎ ভুলে যায়, তেমনি দুঃখের সময়ও মনে হয় এই পরিস্থিতি বুঝি আর শেষ হবে না। ‘যত হাসি তত কান্না’ সেই দুই অবস্থার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দেয় জীবন কখনো একই রকম থাকে না।
তাই রাম সন্না সত্যিই ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি ছিলেন, নাকি লোককথা ও সাহিত্যের হাত ধরে তৈরি হওয়া এক প্রবাদপ্রতিম চরিত্র তার নিশ্চিত উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। রামশংকর শর্মা সম্পর্কিত কাহিনির উল্লেখ থাকলেও সেটিকে ঐতিহাসিক সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার মতো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার পরিচয় যতই অস্পষ্ট হোক, বাংলা ভাষার প্রবাদে রাম সন্না বেশ পরিচিত। আর তার নামে চালু হওয়া একটি ছোট্ট বাক্য আজও বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয় জীবনে যেমন হাসি আছে, তেমনি কান্নাও আছে।
কেএসকে





