মাদক-চাঁদাবাজি থেকে যানজট, আইনশৃঙ্খলা সভায় উঠে এলো নানা সমস্যা
মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও অবৈধ দখল ঠেকানোর পাশাপাশি যানজট ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে ঢাকা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায়।
জেলার চিহ্নিত মাদক স্পটগুলোতে বিশেষ যৌথ অভিযান, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার, ফুটপাত ও অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং জননিরাপত্তা জোরদারে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম। প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ইশরাক হোসেন।
সভায় ঢাকা-১১ আসনের এমপি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম, ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (কেরাণীগঞ্জ) সাংগঠনিক সম্পাদক আরফান ইবনে আমান অমি, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনসহ জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মাদক স্পটে যৌথ অভিযান, অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান
সভায় গেন্ডারিয়া, ঢাকা-১১ আসনের বস্তি এলাকা এবং জেলার অন্যান্য চিহ্নিত মাদক স্পটে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় জানানো হয়, সম্প্রতি মাদকসংক্রান্ত ২৭৪টি মামলা করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময় লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে সাতটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। বাকি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের পদধারীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি তদারকি আরও বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যানজট নিরসন ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে পদক্ষেপ
প্রধান সড়কে অবৈধ সভা-সমাবেশ ও মিছিলের কারণে যানজট সৃষ্টি হলে তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাপ্তান বাজারসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি অবৈধ বাস ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা কমাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা দ্রুত সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কিশোর গ্যাং-চাঁদাবাজি ঠেকাতে ২৪ ঘণ্টা টহল
কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক ২৪ ঘণ্টা পুলিশি টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত চেকপোস্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জোনভিত্তিক রেস্তোরাঁ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে স্পিকার ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ঢাকা-৬ আসনে মাদক ও সংঘর্ষ নিয়ে ইশরাকের বক্তব্য
সভায় নিজের নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-৬ এর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, এ আসনে মাদকের সমস্যা বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাদকের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি সভায় জানান।
গেন্ডারিয়া, ঘুঁটিগড় ও মুনসিরটেকসহ বিভিন্ন এলাকার মাদকসংক্রান্ত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাত এবং যেখানে-সেখানে বাস ও অন্যান্য যানবাহন থামিয়ে রাখার কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও যানজটের বিষয়েও কথা বলেন তিনি।
ধোলাইখাল ট্রাকস্ট্যান্ড ও সদরঘাটের বিভিন্ন সমস্যা ছাড়াও কাপ্তানবাজার ও মুরগিপট্টির বিষয়টি সভায় তুলে ধরেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য।
ইশরাক হোসেন আরও বলেন, সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করার পরও সংশ্লিষ্ট থানা থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগও তিনি সভায় তুলে ধরেন।
পুলিশের চলমান কার্যক্রম তুলে ধরেন এসপি
সভায় ঢাকা জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধের প্রবণতা, মাদকবিরোধী অভিযান, জননিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পুলিশের চলমান কার্যক্রমের ওপর বিস্তারিত উপস্থাপনা দেন পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন।
জেলার বিভিন্ন থানায় পরিচালিত বিশেষ অভিযান, অপরাধ দমন, মাদক নির্মূল, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের নেওয়া ও চলমান পদক্ষেপগুলো তিনি তুলে ধরেন।
পুলিশ সুপার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে পুলিশের পেশাদার ও জনমুখী কার্যক্রমের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে পুলিশ ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশ জনগণের জানমাল রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, মাদক নির্মূল এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তরিকতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে যৌথ অভিযান
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়। সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পুরো জেলায় বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মশক নিধন অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কর্মকর্তাদের জবাবদিহির নির্দেশ
সভায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের তাগিদ দেন প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা সভায় প্রতিটি দপ্তরকে নিজেদের নেওয়া কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে ‘ফিডব্যাক’ আকারে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জনসাধারণের নিরাপত্তাই মূল লক্ষ্য
সভা শেষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম বলেন, জনসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
তিনি সময়াবদ্ধ পরিকল্পনার ভিত্তিতে সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সদস্যরা জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ দেন। এসব মতামতের ভিত্তিতে জননিরাপত্তা জোরদার, আইনশৃঙ্খলার আরও উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মান বাড়াতে গৃহীত ও গৃহীতব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়।
এমডিএএ/এমএমকে







