ভেটিংয়ের অপেক্ষায় নতুন পে-স্কেল, হালনাগাদ হচ্ছে পেনশনভোগীদের তথ্য
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। বর্তমানে খসড়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও হালনাগাদের কাজ চলছে। শিগগির এটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে একটি মূল এসআরও’র পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আরও ৫টি এসআরও জারির প্রস্তুতিও চলছে। একই সঙ্গে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের জন্য আইবাস প্লাস প্লাসে (আইবাস++) প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, সবকিছু নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। পর্যালোচনার মাধ্যমে কোনো অসঙ্গতি পেলে তা আপডেট (হালনাগাদ) করা হচ্ছে। আমরা দ্রুত পর্যালোচনা শেষ করে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেবো। ভেটিং সম্পন্ন হলে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভেটিং হতে কতো সময় লাগতে পারে—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যদি এক পেজের কিছু হতো তাহলে হাতে হাতে নিয়ে গিয়ে ভেটিং করানো যেত। এখানে তো অনেকগুলো কাগজ। নতুন পে-স্কেলের মূল গেজেট হবে একটি। এছাড়া আরও ৫টি এসআরও জারি হবে। অর্থাৎ, মোট ছয়টি এসআরও জারি হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব কার্যক্রম সম্পন্ন করার চেষ্টা করছি। আশা করছি দ্রুতই সবকিছু সম্পন্ন হবে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা আছে কি না—এমন প্রশ্নে এ কর্মকর্তা বলেন, কোনো জটিলতা নেই। সবকিছু নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন কোনো ত্রুটি না থাকে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। যেহেতু ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, তাই সম্পূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে একটু সময় লাগছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ২০১৫ সালে আইবাস প্লাস প্লাসে ছিল না। আবার এখন ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য আইবাস প্লাস প্লাসে কিছু তথ্য আপডেট করার বিষয় আছে। বিশেষ করে যারা এরই মধ্যে অবসরে গেছেন, তাদের পেনশন-সংক্রান্ত তথ্য আইবাস প্লাস প্লাসে হালনাগাদ করতে হবে। তবে বর্তমানে চাকরিতে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো জটিলতা নেই।
বিভিন্ন শ্রেণির জন্য আলাদা এসআরও
নতুন পে-স্কেলের মূল কাঠামোর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক প্রয়োগবিধি নির্ধারণ করা হবে। এজন্য মোট ছয়টি এসআরও জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আলাদা এসআরও জারি করা হবে।
কোনো জটিলতা নেই। সবকিছু নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন কোনো ত্রুটি না থাকে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।—অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা
অর্থাৎ, একটি সাধারণ গেজেটের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামোর মূল সিদ্ধান্ত কার্যকর হলেও বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা পৃথক এসআরওতে স্পষ্ট করা হবে। এতে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করে জাতীয় বেতন স্কেল (পে-স্কেল)-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের শুরুর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন বেতন স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে।
মন্ত্রিসভায় একই সঙ্গে নতুন বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো যুগোপযোগী করতে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়।
নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমানো হয়েছে। বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ অনুপাত কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’
নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সরকার সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ (ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন) পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ পদ্ধতি একসঙ্গে বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় তা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ।
২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমানো হয়েছে
এক্ষেত্রে ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৫৫ শতাংশ।
প্রথমবার প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা, সবাই পাবে মোবাইল ভাতা
জানা গেছে, নতুন বেতন স্কেলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রত্যেক সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
এছাড়া ডিজিটাল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন বেতন স্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী এই ভাতা পাবেন।
দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন বেতন স্কেল এক সঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর কারণ হিসেবে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বলা হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও একইভাবে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
এদিকে, জুডিসিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতন স্কেলের মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
সরকার মনে করছে, পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
উপকার পাবেন ৩৩ লাখের বেশি মানুষ
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এজন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকারের দাবি, মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।
সরকার মনে করছে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এমএএস/এমকেআর



