বিয়ের পর বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনা, কনের ভাই-বোনসহ নিহত ৪
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে বাড়ি ফিরছিল একটি পরিবার। কিন্তু চট্টগ্রামের কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে কলেজ বাজার এলাকায় পৌঁছাতেই সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় বিষাদে। ইউটার্নে একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে কনের ভাই-বোন, মামা ও মাইক্রোবাসচালকসহ চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কনের বাবা-মাসহ আরও ছয়জন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাত সোয়া ১টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কলেজ বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন—কনের ছোট ভাই নিয়াজ মোরশেদ (২৩), ছোট বোন মিনতাহ (২১), মামা ফেরদৌস আলম ফিরোজ (৬০) এবং মাইক্রোবাসচালক হাসান মাহমুদ মুন্না (৩৮)। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান কনের বড় মামা ফেরদৌস আলম ফিরোজ। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান নিয়াজ মোরশেদ, মিনতাহ ও মাইক্রোবাসচালক হাসান মাহমুদ মুন্না।
নিয়াজ মোরশেদ ও মিনতাহ ঈদগাঁও উপজেলা সদরের মাইজপাড়ার মনজুর আলমের সন্তান। ফেরদৌস আলম ফিরোজ ঈদগাঁওয়ের পোকখালীর পশ্চিম গোমাতলীর চরপাড়ার মৃত আবদুল করিম দফাদারের ছেলে। তিনি ঈদগাঁও বাসস্টেশনে আরাফাত শপিং কমপ্লেক্স নামে একটি মার্কেট গড়ে সেখানেই অবস্থান করতেন।
অন্যদিকে মাইক্রোবাসচালক হাসান মাহমুদ মুন্না ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের নতুন অফিস এলাকার মোস্তাক আহমেদের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাইক্রোবাস চালাতেন বলে জানিয়েছেন মাইক্রো-কার সমিতির লাইন পরিচালক রোকন।
এ ঘটনায় আহতরা হলেন, কনের বাবা মনজুর আলম (৫৮), মা নিলুফা ইয়াসমিন(৪৮), নিহত ফিরোজের বউ আরেফা বেগম (৫০), কনের চাচাত ভাই হেলাল উদ্দিন(৪৫), মনজুরের ছোট ভাই মীর কাশেম (৫৫) ও বন্ধু আবুল কালাম (৫৮)।
জানা গেছে, পরিবারের মেঝ মেয়ের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে। শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতিতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলে। অনুষ্ঠান শেষে কনের বাবা-মা, ভাই-বোন, মামা-মামী ও চাচা-চাচিসহ স্বজনরা মাইক্রোবাসে করে কক্সবাজারের ঈদগাঁও সদরের মাইজপাড়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
কনের চাচা ও ঈদগাঁও সেন্ট্রাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুনুর রশীদ জানান, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে সুন্দরভাবেই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়। সবকিছু গুছিয়ে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে টোল প্লাজা অতিক্রমের পর কলেজ বাজার এলাকায় পৌঁছালে একটি কাভার্ডভ্যানের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির সংঘর্ষ হয়।
তিনি বলেন, ‘চাচাতো ভাই মনজুর আলম দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। তার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়েকে ঈদগাঁওতে এবং মেঝ মেয়েকে বাঁশখালীতে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরের স্বজনদের চাহিদা অনুযায়ী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। সুন্দরভাবেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে এমন দুর্ঘটনা ঘটবে, কেউ ভাবেনি।’
মনজুর আলমের প্রতিবেশী ও ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাজী ছৈয়দ আলম বলেন, মনজুর পরিবারটা গোছাতে প্রবাস থেকে একেবারে চলে এসেছিল। বাবার ভিটায় দু-রুমের একটি বাড়ি করেও সন্তানদের পড়ালেখার স্বার্থে চট্টগ্রামে অবস্থান করতেন। বড় দুই মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করে বাকি দুজনকে গুছিয়ে দেওয়ার আগেই আল্লাহ শেষ দুই বাচ্চাকে একসঙ্গে নিয়ে গিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে। মনজুরের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জেনেছি। এ দুর্ঘটনা এলাকাবাসীকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে।
নিহতদের স্বজন স্থানীয় মেম্বার বজল আহমদ বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহগুলো এলাকায় আনা হচ্ছে। এশার নামাজের পর ঈদগাঁও হাই স্কুল মাঠে তাদের জানাজা শেষে নিয়াজ মোরশেদ, মিনতাহা ও তাদের মামা ফেরদৌস আলম ফিরোজকে মেহেরঘোনা কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ঈদগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমা বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। এটা খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। বিয়ের আনন্দটা বিষাদে রূপ নিয়েছে একটি দুর্ঘটনায়। পরিবারের অন্য স্বজনদের বিধাতা ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন।’
সায়ীদ আলমগীর/কেএইচকে/এএসএম


