‘জিল্লুর শেখের লাশ আন্দোলনকারীরা ইউনিভার্সিটির ভেতরে নিয়ে আসে’
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে পুলিশ, র্যাব ও আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী হামলা চালায় বলে জবানবন্দি দিয়েছেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মো. শাবাব হোসেন মেহের।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসেবে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, হামলার সময় পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও শটগান থেকে গুলি চালায়। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে আশ্রয় নিলে পুলিশ গেটের ভেতর শটগান ঢুকিয়ে তাদের ওপর গুলি করে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্র পক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শাবাব হোসেন।
জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে করা মামলায় তিনি এ জবানবন্দি দেন।
মামলার আসামি সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক এবং জুনাইদ আহমেদ পলক কারাগারে রয়েছেন।
জবানবন্দিতে ১৮ জুলাইয়ের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শাবাব বলেন, ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ, র্যাব ও আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী হামলা চালায়। আমাদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও শটগান থেকে গুলি করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘তাদের হামলার ফলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিলে পুলিশ গেটের ভেতরে শটগান ঢুকিয়ে তাদের ওপর গুলি করে। তাদের হামলায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থী আহত ও নিহত হন।’
শাবাব বলেন, ওই দিন ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র জিল্লুর শেখ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সাড়ে ১২টার দিকে জিল্লুর শেখের লাশ আন্দোলনকারীরা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভেতরে নিয়ে আসে। আমি সেখানে ছিলাম।
তিনি আরও বলেন, আহতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহতদের আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। আন্দোলন শেষে সন্ধ্যায় তিনি বাসায় ফিরে যান।
‘ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়’
জবানবন্দিতে শাবাব বলেন, ১৮ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। ২৩ জুলাইয়ের পর সীমিত আকারে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হলে তারা জানতে পারেন, সারা দেশে ব্লক রেইড হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের অনেকে আহত ও নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ওই বছরের আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কল রেকর্ড শুনতে পান। তার দাবি, ওই কল রেকর্ডে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের কথোপকথন ছিল।
শাবাবের দাবি, ওই কথোপকথন থেকে তিনি জানতে পারেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের তত্ত্বাবধানে জুনাইদ আহমেদ পলক ইন্টারনেট বন্ধ করেছিলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়ী করেন শাবাব।
বিশেষ করে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনায় সজীব ওয়াজেদ জয়, জুনাইদ আহমেদ পলক ও সালমান এফ রহমানকে দায়ী করেন তিনি। একই সঙ্গে এসব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন সাক্ষী।
জয়-পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের অনুমোদনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি স্ট্যাটাস দেন।
ওই স্ট্যাটাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ মার্চ ছাত্র-শিক্ষকদের গণহত্যা এবং আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ স্লোগান নিয়ে মন্তব্য করা হয়।
এরপর একই দিন রাত পৌনে ১টার দিকে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ব্যবহৃত ‘রাজাকার’ স্লোগানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ক্যাপশনসহ একটি ছবি পোস্ট করার অভিযোগ রয়েছে পলকের বিরুদ্ধে। রাত ১টা ১৫ মিনিটে তিনি আরও একটি ছবিসহ পোস্ট শেয়ার করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে জুনাইদ আহমেদ পলকের এসব ফেসবুক পোস্টের পর ১৪ ও ১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী হামলা শুরু করে।
এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন এবং আহতদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের গুরুতর জখম করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিরীহ ও নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত ছিল।
এতে আরও বলা হয়, ওই সময়ে সারা দেশে আবু সাঈদসহ এক হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হন। এসব অপরাধ আসামিদের নির্দেশ, জ্ঞাতসারে অথবা অপরাধ সংঘটনের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এফএইচ/জেএইচ

