করছাড়ের সুফল নেই বাজারে, উল্টো বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
চলতি অর্থবছরের বাজেটে কৃষিপণ্য, সোলার, কম্পিউটার, ইলেকট্রিক পণ্য, মসলাসহ অর্ধশতাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানো হলেও বাজারে এর সুফল মিলছে না। বেশিরভাগ পণ্যের দাম আগের মতোই রয়েছে। উল্টো কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে ভোক্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী করছাড়ের সুবিধা শেষ পর্যন...

চলতি অর্থবছরের বাজেটে কৃষিপণ্য, সোলার, কম্পিউটার, ইলেকট্রিক পণ্য, মসলাসহ অর্ধশতাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানো হলেও বাজারে এর সুফল মিলছে না। বেশিরভাগ পণ্যের দাম আগের মতোই রয়েছে। উল্টো কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে ভোক্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী করছাড়ের সুবিধা শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পৌঁছাচ্ছে না।

তবে ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, দেশে জ্বালানি সংকট, বন্যা ও অতিবৃষ্টিসহ নানান কারণ দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়ার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর কমানো বা অব্যাহতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; এর সুফল ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা বিশ্লেষণ ও নজরদারি করা জরুরি।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট চলতি বছরের ১১ জুন পেশ করা হয়। এতে ৬৩টি নিত্যপণ্যের কর কমানো হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি করা সব ধরনের মসলার ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। চাল, আটা, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি মৌলিক কৃষিজাত ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়।

বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক-কর কমানো হলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। খুচরা পর্যায়ে পণ্যগুলোর দাম এক পয়সাও কমেনি। বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে দেখা দরকার।—এস এম নাজের হোসাইন

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গত ১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৯ শতাংশ। বিভিন্ন মসলার দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ, চিনি ২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সাধারণ মানের খেজুরের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানোর ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুমোদন দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতদিন বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৯৯ টাকা। এখন নতুন দাম হয়েছে ২০৪ টাকা। এর আগে ব্যবসায়ীরা প্রতি লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

জানতে চাইলে টি কে গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) মো. শফিউল আতহার তসলিম জাগো নিউজকে বলেন, আমদানি পর্যায়ে সব খরচ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচও বেড়েছে। এসব কারণে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে।

বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৬০ টাকা, মিনিকেট ৭২ টাকা, নাজিরশাইল ৮৮ টাকা এবং কাটারি নাজির ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্র্যান্ড ও মানভেদে মিনিকেটের দামে পার্থক্য রয়েছে।

পাইকারি বাজারেও চালের মূল্যবৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম পড়েছে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, কয়েক ধাপে হাতবদল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় চালের দাম কখনো কেজিতে দু-তিন টাকা বাড়ে, আবার কখনো কমে যায়।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণ চালের দাম ওঠানামা করলেও সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে বেশি। এক মাস আগেও প্রতি কেজি ১৬০-২০০ টাকায় মিলেছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সুগন্ধি চাল, যা বর্তমানে বেড়ে ১৭০-২১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

বাজেটে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরে কর সুবিধা দেওয়া হয়। লিপস্টিক, ত্বকের ক্রিম, ময়েশ্চার লোশন ও ফেসওয়াশসহ সাত শ্রেণির পণ্যে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য কমানো হয়। বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ও সোলার পণ্যেও দেওয়া হয় কর সুবিধা। তবে এসব সুবিধার বেশিরভাগেরই ইতিবাচক প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে না।

সোলার পণ্য মানুষের দোরগোড়ায় নিতে কিছু সময়ের জন্য কর অবকাশের পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শুধু সোলার নয়, কম্পিউটার পণ্যের বাজারেও করছাড়ের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।—জাহিদুল ইসলাম

কয়েক মাস ধরে দেশে জ্বালানি সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় সারাদেশে লোডশেডিং করা হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে শিল্পখাতেও। এ অবস্থায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। কিন্তু সোলার পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর পরও ঢাকার বাজারে পণ্যটির দাম কমেনি। বরং চাহিদা বাড়ার সুযোগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম আরও বেড়েছে।

সরেজমিনে রাজধানীর নবাবপুর, কাপ্তানবাজার, সুন্দরবন স্কয়ার ও গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ৫৫০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৯ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫ কিলোওয়াটের ইনভার্টারের দাম ৪৮ হাজার থেকে ৭৭ হাজার টাকা। আর ৫ দশমিক ১২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার লিথিয়াম ব্যাটারি বিক্রি হচ্ছে ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি—এই তিনটি প্রধান উপকরণ কিনতেই খরচ হচ্ছে ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এছাড়া ২ হাজার থেকে ২৫০০ ওয়াটের সোলার হাইব্রিড সেটআপ ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করহার কমার পর দাম কমার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে ক্রেতাকে আগের তুলনায় কম অর্থ দিতে হচ্ছে না।

অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন অর্থবছরের ব্যবস্থায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে শূন্য এবং সোলার প্যানেলের শুল্ক ১ শতাংশ থেকে শূন্য করা হয়েছে। সোলার ইনভার্টারও শুল্ক-কর অব্যাহতির আওতায় এসেছে। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ব্যাটারি সেল ও ব্যাটারি প্যাকসহ বিভিন্ন উপকরণেও শর্তসাপেক্ষে রেয়াত দেওয়া হয়েছে।

কাপ্তানবাজারের তাসফিয়া সোলার অ্যান্ড ইলেকট্রিকের মালিক কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে সোলার পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। প্যাকেজ আকারে বিক্রি বাড়লেও দাম কমেনি। কয়েক মাস আগে যে ব্যাটারি ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন সেটির দাম ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকায় উঠেছে। 

জানতে চাইলে এনগ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সরকার বাণিজ্যিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে করছাড় দিলেও এর সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সোলার মাউন্টিংয়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ এবং ব্যাটারিতে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত কর রয়েছে।

আমদানি পর্যায়ে সব খরচ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচও বেড়েছে। এসব কারণে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় লিটারে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে।—মো. শফিউল আতহার তসলিম

তিনি বলেন, সোলার পণ্য মানুষের দোরগোড়ায় নিতে কিছু সময়ের জন্য কর অবকাশের পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শুধু সোলার নয়, কম্পিউটার পণ্যের বাজারেও করছাড়ের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। এক বছর আগেও যে দামে কম্পিউটার কেনা যেত, এখন একই কনফিগারেশনের জন্য গুনতে হচ্ছে বেশি টাকা।

‘সবচেয়ে বেশি বেড়েছে র‌্যাম, এসএসডি ও গ্রাফিকস কার্ডের দাম। কোনো কোনো মডেলের ক্ষেত্রে এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি’—যোগ করেন তিনি।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৮ জিবি ডিডিআর৪ র‌্যাম ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৬ জিবি ডিডিআর৫ র‌্যামের কিছু মডেলের দাম গত জুনে আনুমানিক ১২ থেকে ১৬ হাজার টাকা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৮ থেকে ৩৩ হাজার টাকা হয়েছে। ৫১২ জিবি এসএসডির দাম জুনে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা থাকলেও এখন তা ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২ জিবি গ্রাফিকস কার্ড ৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করহার কমায় মনিটরের দাম কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক-কর কমানো হলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। খুচরা পর্যায়ে পণ্যগুলোর দাম এক পয়সাও কমেনি। বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, সরকার যে সুবিধাগুলো দিচ্ছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে যাচ্ছে কি না, তার নজরদারি করা প্রয়োজন। হাজার কোটি টাকার করছাড় দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ সুবিধা পাচ্ছেন না।

‘সরকারের সিদ্ধান্তের সুবিধা মাঝখানে অন্য কেউ নিচ্ছে কি না, সেটিও দেখা দরকার। পণ্যের দাম নিয়ে গণমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন হচ্ছে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন’—যোগ করেন নাজের হোসাইন।

এসএম/এমকেআর/ এমএফএ

Original Source
https://www.jagonews24.com/economy/news/1156922
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Economy