পুলকের চিরকুটে গণমাধ্যমের বিবেকের প্রশ্ন

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
সমকাল পত্রিকার বরিশাল অফিসের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। গত বছরের আগস্টে সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের আত্মহত্যার পরও একই প্রশ্ন উঠেছিল। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল শহরের প্যারারা র...

সমকাল পত্রিকার বরিশাল অফিসের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। গত বছরের আগস্টে সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের আত্মহত্যার পরও একই প্রশ্ন উঠেছিল।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল শহরের প্যারারা রোডে সমকাল কার্যালয় থেকে পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৫৭ বছর বয়সী পুলক চ্যাটার্জি ২০২৩ সাল পর্যন্ত সমকালের ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। একটি চিরকুটে তিনি নিজের শারীরিক অসুস্থতা ও রোগ-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারার কথা লিখে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় বলে উল্লেখ করেছেন। আরেকটি চিরকুটে তিনি সমকালে তার পাওনার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন: ‘যদি পার সমকালে আমার পাওনা টাকা নিয়ে তোমার বৌদিকে পৌঁছে দিও।’

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর সংবাদে সমকাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তার পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সমকালের বিজ্ঞাপন ও আইটি বিভাগের অনাপত্তি নিয়ে তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা চলে। গত মাসে দুই বিভাগ অনাপত্তিপত্র হিসাব বিভাগে জমা দেয় এবং তারা হিসাবটি চূড়ান্ত করছিল। প্রশ্ন হলো, ২০২৩ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার পরে তার পাওনা পরিশোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বা অনাপত্তিপত্র দিতে এত বছর লাগল কেন? সরকারি অফিসেও কি এই পরিমাণ আমলাতন্ত্র আছে? তাছাড়া যদি গত মাসে সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, সেটি কি পুলক চ্যাটার্জি জানতেন না? তার চিরকুটের ভাষায় এটা প্রমাণিত হয় না যে, তার পাওনা পরিশোধের বিষয়ে তিনি আদৌ কিছু জানতেন বা তাকে জানানো হয়েছে। তার মানে নিজের জীবন উৎসর্গ করে পুলককে তার পাওনা আদায় করতে হলো!

তার আত্মহনন এবং চিরকুটে সমকালে পাওনার প্রসঙ্গ না থাকলে কর্তৃপক্ষ এই ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করত কি না, সন্দেহ আছে। কেননা তার মর্মান্তিক মৃত্যুর পরে সমকালের সাবেক একাধিক সাংবাদিক ফেসবুকে তাদের পাওনা না পাওয়ার গল্প লিখেছেন—যা সমকালের মতো একটি জনপ্রিয় পত্রিকা এবং পত্রিকার মালিকের পেশাদারি ও মানবিকতাকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও সাংবাদিককে বঞ্চিত করার ঘটনায় দেশের সব গণমাধ্যমের চরিত্র কমবেশি একই রকম। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান পেশাদারি মেনে চলে। নিয়ম মেনে বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেলেও বা চাকরিচ্যুত হলেও ঠিকঠাক তাদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গণমাধ্যমে সেই সংখ্যাটি কত বা কত শতাংশ—সেটি বিরাট প্রশ্ন।

পুলক চ্যাটার্জিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। কৈশোরে আমাদের সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলোয় তিনিসহ বরিশাল শহরে তার সমসাময়িক অন্য সাংবাদিকদের মধ্যে লিটন বাশার, শওকত মিল্টন, আখতার ফারুক শাহীন ও তৌফিক মারুফরা আমাদের কাছে ছিলেন তারকাসমান। তাদের মধ্যে ২০১৭ সালে লিটন বাশারের মৃত্যু হয় আকস্মিকভাবে। তিনি ইত্তেফাকের বরিশাল ব্যুরোর রিপোর্টার ছিলেন। পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পরে যখন তার সমকালে পাওনা নিয়ে ফেসবুকে অনেক লেখালেখি হচ্ছে, তখন লিটন বাশারের ছোট ভাই সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমনও ফেসবুকে লিখেছেন, লিটন বাশারের পাওনা টাকাও ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করেনি। একইভাবে আরও একাধিক পত্রিকার সাবেক সাংবাদিকরাও নিজেদের পাওনা না পাওয়ার কথা লিখেছেন—যা মূলত একটা প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের প্রধান চ্যালেঞ্জই হলো পেশাগত অনিশ্চয়তা। যেকোনো সময় যেকোনো অজুহাতে কিংবা যেকোনো কারণে যে কারও চাকরি চলে যেতে পারে। মূলধারার পত্রিকার সাংবাদিক হলে তিনি ওয়েজবোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী কিছু আর্থিক সুবিধা পেলেও টেলিভিশন এবং অনলাইনে কোনো ওয়েজবোর্ডও নেই। ফলে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিচ্যুত হলে কোনো আর্থিক সুবিধা নাও পেতে পারেন। না পেলে তিনি সর্বোচ্চ শ্রম আদালতে যেতে পারেন। যদিও অনেকেই এসব ঝামেলায় যেতে চান না। অনেকে হতাশ হয়ে পেশা ছেড়ে দেন। সম্ভব হলে কেউ দেশও ছাড়েন। পুলক চ্যাটার্জির বন্ধু তৌফিক মারুফ ও শওকত মিল্টন আরও আগেই দেশ ছেড়েছেন। স্বাধীন ও সামাজিকভাবে সম্মানজনক পেশা সাংবাদিকতার এটি সবচেয়ে অন্ধকার দিক—যেটি পুলক চ্যাটার্জি বা বিভুরঞ্জনদের আত্মহননের আগে টের পাওয়া যায় না।

সিনিয়র সাংবাদিক কামাল আহমেদের নেতৃত্বে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছিল, তাদের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, গণমাধ্যমকর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা মূলত তাদের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের গণমাধ্যম বিকাশে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার দিকে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। বর্তমানে অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। তবে তাদের মধ্যে খুব কমই সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধার প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিয়েছে।

যে সাংবাদিকরা অন্যের অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার তথা যেকোনো অধিকার লঙ্ঘনের খবর দেশ ও বিশ্বকে জানান, তাদের নিজেদের অধিকারই প্রতিনিয়ত ভূলুণ্ঠিত হয়। কিন্তু তাদের সেই অধিকার নিয়ে অন্য কোনো পেশার লোক রাস্তায় নামে না বা সেটা বাস্তবসম্মতও নয়। ফলে সাংবাদিকের নিজের অধিকার হরণের খবর সুইসাইড নোট আর ব্যক্তিগত ডায়েরি ছাড়া আর কোথাও সম্ভবত লেখা হয় না।

নির্মম সত্য হলো, যে সাংবাদিকরা অন্যের অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার তথা যেকোনো অধিকার লঙ্ঘনের খবর দেশ ও বিশ্বকে জানান, তাদের নিজেদের অধিকারই প্রতিনিয়ত ভূলুণ্ঠিত হয়। কিন্তু তাদের সেই অধিকার নিয়ে অন্য কোনো পেশার লোক রাস্তায় নামে না বা সেটা বাস্তবসম্মতও নয়। ফলে সাংবাদিকের নিজের অধিকার হরণের খবর সুইসাইড নোট আর ব্যক্তিগত ডায়েরি ছাড়া আর কোথাও সম্ভবত লেখা হয় না।

বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী সব পেশার শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও গত ৫৫ বছরে গণমাধ্যমকর্মীদের ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ, অন্যান্য পেশায় শ্রম আইন যতটা প্রয়োগ হয়েছে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তা একেবারেই অপ্রতুল। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও নিউজপেপার এমপ্লয়িজ (কন্ডিশন্স অব সার্ভিস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর বিধানসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়নি। এছাড়া প্রেস কাউন্সিলকেও সাংবাদিকদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষার বিষয়ে কোনো ভূমিকা বা এখতিয়ার দেওয়া হয়নি।

সাংবাদিক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন সময় ওয়েজ বোর্ড গঠিত হলেও এর বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কিছু পত্রিকা এখনো পঞ্চম ওয়েজ বোর্ডের বেতন কাঠামো অনুসরণ করে, আবার কিছু প্রথম সারির পত্রিকা নির্ধারিত কাঠামোর চেয়ে বেশি সুবিধা দেয়। নবম ওয়েজ বোর্ড ঘোষিত হলেও তা শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসে পূর্ণভাবে এবং ইংরেজি দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে আংশিকভাবে কার্যকর হয়েছে, অন্য কোথাও নয়। সংবাদপত্র মালিক সমিতির মামলায় এর বাস্তবায়ন গত ছয় বছর ধরে আটকে আছে। এছাড়া মালিকদের সংগঠন (নোয়াব) ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে দুর্নীতির কারণে অসম প্রতিযোগিতার অভিযোগ এনেছে।

বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির উচ্চ হার ও অন্যান্য কারণে জীবনযাপনের ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় সংবাদকর্মীদের প্রকৃত মজুরি মোটেও বাড়েনি। ঢাকার বাইরে জীবনযাপনের ব্যয় কিছুটা কম হলেও সংবাদমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধিদের যে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, তাও বর্তমান জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একেবারেই অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের সংবাদদাতাদের কোনো বেতনই দেওয়া হয় না।

সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষায় বেশ কিছু সুপারিশ করেছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। যেমন সাংবাদিকদের স্থায়ী চাকরির শুরুতে একটি অভিন্ন ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা হবে সরকারি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মূল বেতনের সমান; ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যধিক বেশি হওয়ার দরুন ঢাকায় নিয়োজিত সাংবাদিকরা মূল বেতনের সঙ্গে ‘ঢাকা ভাতা’ (অ্যালাউন্স) প্রাপ্য হবেন; মূল বেতনের বাইরে সাংবাদিকরা বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, মূল বেতনের সমপরিমাণ উৎসব ভাতা, ঝুঁকি ভাতা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), ফোন বিল, ইন্টারনেট বিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অবসর ভাতা কিংবা গ্র্যাচুইটি পাবেন; প্রতি বছরের শুরুতে পূর্ব বছরের গড় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকদের বেতন বাড়বে ইত্যাদি।

এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সাংবাদিকের পেশাগত অনিশ্চয়তা কমবে এবং তার মধ্য দিয়ে তাদের অন্তত আর্থিক দুশ্চিন্তা হ্রাস পাবে। কিন্তু এই সুপারিশগুলো যে বাস্তবায়ন হবে না, তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। তখনই গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সমালোচনা এসেছে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের তরফে।

বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে আবারও গণমাধ্যম সংস্কারের প্রশ্নটি নানা ফোরামে আলোচিত হচ্ছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন হোক বা না হোক, গণমাধ্যমে পেশাদারি তথা সাংবাদিকদের চাকরির সুরক্ষা এবং একটি মোটামুটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ যাতে তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নাহয় আজ বিভুরঞ্জন, কাল পুলক চ্যাটার্জি এবং পরশু অন্য কোনো সাংবাদিককে সুইসাইড নোট লিখে ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলে পড়তে হবে—যা শুধু গণমাধ্যমের নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখোশটাই খুলে দেবে।

লেখক : সাংবাদিক লেখক

এইচআর/জেআইএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/opinion/article/1156944
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in World