গুদামে সার, মাঠে সংকট—সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশের কৃষিতে সার শুধু উৎপাদন উপকরণ নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আয়, বাজারমূল্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি কৌশলগত উপাদান। তাই সার সংকটকে কেবল মাঠের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর বিস্তৃত অভিঘাত অদৃশ্য থেকে যায়। সময়মতো সঠিক পরিমাণ ও নির্দিষ্ট ধরনের সার না পেলে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়, বাড়ে উৎপাদন ব্যয়, কমে যেতে পারে ফলন। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজার ও ভোক্তার ওপরও পড়ে।
জাতীয় পর্যায়ে গুদামে সার মজুত থাকা আর প্রয়োজনের সময়ে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। ২৫ আগস্ট সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশে প্রায় ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ৮২ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৪৬ হাজার টন। সরকার সামগ্রিকভাবে সার সংকট নেই বললেও মাঠের চিত্র সব সময় সেই নিশ্চয়তা দেয় না।
বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কোথাও কোথাও বেশি দামেও সার কিনতে হয়েছে। অর্থাৎ গুদামে সার থাকলেও সরবরাহ ও বণ্টনের দুর্বলতায় মাঠে সংকট তৈরি হতে পারে। কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সঠিক পরিমাণ, নির্ধারিত মূল্য ও নিশ্চিত প্রাপ্যতা না থাকলে কাগজে থাকা মজুত তার উৎপাদন পরিকল্পনায় কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
বাংলাদেশে বছরে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় এবং এর বড় অংশই আমদানিনির্ভর। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানির ওপরও বড় নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে সরকারি সার কারখানাগুলোর মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও গ্যাসের ঘাটতি, পুরোনো কারখানা এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে বাস্তব উৎপাদন অনেক কমে যায়। ফলে বাড়ে আমদানিনির্ভরতা।
ইউরিয়া উৎপাদনে গ্যাস অপরিহার্য হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমলে সার কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকটে একাধিক ইউরিয়া কারখানা বন্ধ থাকায় দেশীয় উৎপাদন কমেছে এবং আমদানির প্রয়োজন বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, গ্যাস সংকট শুধু শিল্পের সমস্যা নয়, এর অভিঘাত কৃষিতেও পৌঁছে যায়। শিল্পে গ্যাসের ঘাটতিতে উৎপাদন কমে, সার কারখানায় গ্যাসের সংকটে কৃষি উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং সার সরবরাহে সমস্যা হলে কৃষির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবেই জ্বালানি, শিল্প ও কৃষি একই অর্থনৈতিক চক্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর সার সরবরাহ আন্তর্জাতিক বাজার, জাহাজ চলাচল, জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা সার আমদানিতেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ কারণে সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আমন মৌসুম সামনে রেখে ২০২৬ সালের মে মাসে ১৭ লাখ টনের বেশি সার আমদানির পরিকল্পনা করা হয় এবং পরে আরও আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। আগস্টে ১ লাখ ১৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ হাজার টন এমওপি ও ৪০ হাজার টন গ্র্যানুলার ইউরিয়া।
তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আমদানির পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য মজুত, সময়মতো খালাস, পরিবহন এবং কার্যকর বণ্টন নিশ্চিত করা। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো সংকট দেখা দিলে শুধু অর্থ থাকলেই তাৎক্ষণিকভাবে সার সংগ্রহ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই আমদানির উৎস বহুমুখী করা, আগাম ক্রয় পরিকল্পনা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সারের সরবরাহব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে সরকার পুরোনো ব্যবস্থার অসংগতি দূর করে সার বিতরণ আরও সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করে। এতে ডিলার কাঠামো পুনর্বিন্যাস, নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির ভূমিকা বাড়ানোর কথা বলা হয়। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু নীতিমালা পরিবর্তনের সময় মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে ডিলার পরিবর্তন, সরবরাহে বিলম্ব, বিক্রয়কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা কিংবা দায়িত্বের অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে।
সার সংকটকে শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ সমস্যা হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটি জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের সক্ষমতা এবং ভোক্তার জীবনযাত্রার প্রশ্ন। আজ সার সরবরাহের দুর্বলতাকে অবহেলা করলে আগামীকাল উৎপাদন কমা, খাদ্যের দাম বাড়া এবং কৃষকের আয় কমার মাধ্যমে তার মূল্য দিতে হতে পারে। সার নিয়ে সতর্কতা তাই শুধু কৃষককে রক্ষা করার বিষয় নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির উৎপাদনচক্র রক্ষারও অন্যতম শর্ত।
এর চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ে কৃষকের ওপর। তাই শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও হতে হবে সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও কৃষকবান্ধব। একটি মৌসুমের মাঝপথে বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে যদি কৃষককে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলা হয়, তাহলে ভালো উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সরবরাহ, ডিলার ও কৃষকের জন্য পরিষ্কার নির্দেশনা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
সারের দাম সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে সরকারি খুচরা মূল্যে ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা। সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে দাম সহনীয় রাখলেও নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে বেশি দামে কিনতে হলে কৃষকের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
ডিজেল, সেচ, শ্রম ও বীজসহ অন্যান্য উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয় কৃষকের নগদ প্রবাহে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ফসল বিক্রির সময় ন্যায্যমূল্য না পেলে সংকট আরও তীব্র হয়। ফলে সার সংকট শুধু উৎপাদনের নয়, কৃষকের আর্থিক সক্ষমতারও সমস্যা। একই সঙ্গে প্রয়োজন সুষম সার ব্যবস্থাপনা।
দীর্ঘদিনের ইউরিয়াকেন্দ্রিকতা, পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা এবং মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার বাস্তবতায় শুধু সার আমদানি বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে কোন জমিতে কোন ফসলে কত ইউরিয়া, ফসফরাস ও পটাশ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে। এতে কৃষকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে, উৎপাদন দক্ষতা বাড়বে এবং মাটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ভারসাম্যও রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে তথ্যনির্ভর ও স্বচ্ছ করা। কোন উপজেলায় কত জমিতে কোন ফসল আবাদ হচ্ছে, সম্ভাব্য চাহিদা কত, সরকারি গুদাম ও ডিলারের কাছে কত সার মজুত রয়েছে, কত বিক্রি হয়েছে এবং কৃষকের কাছে প্রকৃত প্রাপ্যতা কত—এসব তথ্য নিয়মিত একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণ করা গেলে গুদামের মজুত ও মাঠের সরবরাহের ব্যবধান দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
একই সঙ্গে ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ, পরিবহন ও সরবরাহের তথ্যও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সার সংকটের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু গুদামের মজুত নয়, বরং কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সঠিক দামে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া। এই জায়গায় ব্যর্থ হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, কৃষকের ব্যয় বাড়বে এবং ভবিষ্যতে খাদ্যের সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। জমিতে সময়মতো সার না পৌঁছালে ফলন কমবে, সরবরাহ সংকুচিত হলে খাদ্যের দাম বাড়বে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে। অর্থাৎ গুদামের একটি হিসাব শেষ পর্যন্ত কৃষকের জমি পেরিয়ে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এই কারণেই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় সার ব্যবস্থাপনাকে কৌশলগত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। আমদানি, দেশীয় উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা, মজুত, পরিবহন, ডিলার ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের বণ্টনকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। জাতীয় মজুত নিরাপদ পর্যায়ে রাখা, আমদানির উৎস বহুমুখী করা, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, সার কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষকের কাছে সরকারি দামে সময়মতো সার পৌঁছাচ্ছে কি না, তার কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মাটি পরীক্ষা ও ফসলভিত্তিক সুষম সার ব্যবহারে কৃষককে কার্যকর পরামর্শ দিতে হবে। কারণ খাদ্যনিরাপত্তা শুধু কত ধান, গম, ভুট্টা বা সবজি উৎপাদিত হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো পাওয়া, কৃষকের লাভজনক উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে খাদ্য থাকা—সবই খাদ্যনিরাপত্তার অংশ।
সুতরাং সার সংকটকে শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ সমস্যা হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটি জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের সক্ষমতা এবং ভোক্তার জীবনযাত্রার প্রশ্ন। আজ সার সরবরাহের দুর্বলতাকে অবহেলা করলে আগামীকাল উৎপাদন কমা, খাদ্যের দাম বাড়া এবং কৃষকের আয় কমার মাধ্যমে তার মূল্য দিতে হতে পারে। সার নিয়ে সতর্কতা তাই শুধু কৃষককে রক্ষা করার বিষয় নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির উৎপাদনচক্র রক্ষারও অন্যতম শর্ত।
লেখক: কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
এইচআর/জেআইএম


