বাব আল-মান্দেবও অনিরাপদ, জ্বালানি-বাণিজ্যে বাড়ছে ঝুঁকি

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
হরমুজের পর লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এখন নিরাপদ নয়। হামলার ঝুঁকি এড়াতে এরই মধ্যে সৌদি আরব থেকে আসা একটি অপরিশোধিত জ্বালানিবাহী জাহাজ প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি পথ ঘুরে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। এতে সময় লেগেছে ৫২ দিন। সরাসরি বাব আল-মান্দেব হয়ে এলে এই যাত্রায় সময় লাগতো ১...

হরমুজের পর লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এখন নিরাপদ নয়। হামলার ঝুঁকি এড়াতে এরই মধ্যে সৌদি আরব থেকে আসা একটি অপরিশোধিত জ্বালানিবাহী জাহাজ প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি পথ ঘুরে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। এতে সময় লেগেছে ৫২ দিন।

সরাসরি বাব আল-মান্দেব হয়ে এলে এই যাত্রায় সময় লাগতো ১৩-১৬ দিন। এতে বেড়েছে জ্বালানি পরিবহনের সময়, খরচ ও ঝুঁকি। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘দ্বিমুখী অভিঘাত’ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে পোশাক ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশ কিছুটা অনিশ্চিত উৎসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, অপরিশোধিত জ্বালানি নিয়ে এমটি নিনেমিয়া নামে একটি ট্যাংকার সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ২৩ জুলাই যাত্রা শুরু করে। বাধ্য হয়ে ওই ট্যাংকার বাব আল-মান্দেব প্রণালি এড়িয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তবে চট্টগ্রামে প্রবেশের পরও ট্যাংকারটি পড়েছে দুর্যোগের মুখে। আল মান্দেব প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন ও অন্য পাশে আফ্রিকার দেশ জিবুতি।

অনিরাপদ হয়ে ওঠা আল মান্দেব প্রণালি এখন নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে দেশের বাণিজ্যে। বিশেষত জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। এছাড়া রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশও এই পথে পরিচালিত হয়। ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে এ পথেও পোশাক রপ্তানি হয়।

‘বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে’

নতুন করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির সংকটকে দেশের অর্থনীতির জন্য এক বিপজ্জনক ‘দ্বিমুখী অভিঘাত’ বলে মনে করছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব প্রণালির সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিপজ্জনক ‘দ্বিমুখী অভিঘাত’। সৌদি আরবের লোহিত সাগরভিত্তিক বিকল্প পথও অনিরাপদ হয়ে পড়ায় এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।’

বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার বরাত দিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি জানান, প্রতিদিন শতকোটি ডলার বাণিজ্যের এই রুট কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকলেই বৈশ্বিক ক্ষতি শত শত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। তাছাড়া জাহাজগুলো আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে যাতায়াত করতে বাধ্য হলে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় এবং ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি ফ্রেইট ও বিমা খরচ গুনতে হবে।

আসন্ন শীতে ইউরোপে গ্যাস ও এলএনজির (এলএনজি) বৈশ্বিক চাহিদা আকাশচুম্বী হতে চলায় উন্নত দেশগুলো এখনই চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে কিনে নিজস্ব রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও কৌশলগত রিজার্ভ বাড়াতে না পারলে শীতের পিক টাইমে তীব্র দামের কারণে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।-ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ

তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘আসন্ন শীতে ইউরোপে গ্যাস ও এলএনজির (এলএনজি) বৈশ্বিক চাহিদা আকাশচুম্বী হতে চলায় উন্নত দেশগুলো এখনই চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে কিনে নিজস্ব রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও কৌশলগত রিজার্ভ বাড়াতে না পারলে শীতের পিক টাইমে তীব্র দামের কারণে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

এর সরাসরি প্রভাবে তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে কল-কারখানা বন্ধের মুখে পড়বে, যা রপ্তানি আয়ে ধস নামানোর পাশাপাশি শিল্পোৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে স্থানীয় মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে বলে মনে করেন তিনি।

‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। স্পট মার্কেটের অনিশ্চয়তার ফাঁদ এড়াতে সরকারকে এখনই জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিশ্চিত করা, আপৎকালীন বাফার স্টক বাড়ানো, আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা, শিপিং ব্যয়ে নীতিসহায়তা দেওয়া এবং একটি সমন্বিত আপৎকালীন জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ যোগ করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি।

একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়বে, অন্যদিকে অনিশ্চয়তা

এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো জ্বালানি সংকট। ক্রেতারাও বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত। এর মধ্যে হরমুজে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের দেশেও ডিজেল ও তেলের সংকট দেখা দিতে পারে। তেলের দামও অনেক বেড়ে গেছে, যা সরকারের জন্য সামাল দেওয়াও কঠিন। পাশাপাশি এলএনজি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ কিছুটা অনিশ্চিত উৎসে পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের মূল উদ্বেগ হলো, তারা যে অর্ডার দেবে, বাংলাদেশে সেই পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে কি না ও সময়মতো তা সরবরাহ করা যাবে কি না। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়বে, অন্যদিকে এই অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়বে।’

তেলের দাম বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়বে ও চাহিদা কমে যাবে। চাহিদা কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা এমন জায়গা থেকে পণ্য নিতে চাইবে, যেখানে কম সময়ে অর্ডার দিয়ে সময়মতো পণ্য পাওয়া যাবে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ক্রেতাদের কাছে কিছুটা অনিশ্চিত উৎসে পরিণত হয়েছে।-বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ

তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়বে ও চাহিদা কমে যাবে। চাহিদা কমার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা এমন জায়গা থেকে পণ্য নিতে চাইবে, যেখানে কম সময়ে অর্ডার দিয়ে সময়মতো পণ্য পাওয়া যাবে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ক্রেতাদের কাছে কিছুটা অনিশ্চিত উৎসে পরিণত হয়েছে।’

আমাদেরও খরচের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এমনিতেই প্রতিযোগিতামূলক খরচে উৎপাদন করতে পারছি না। সামনে জাহাজ ভাড়া বাড়বে, দেশে মূল্যস্ফীতি বেশি, তেলের দামও বেশি। এর সঙ্গে সরকারের বেতন বাড়ানোর প্রভাবও সামগ্রিক খরচের ওপর পড়বে।’

‘সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের। সরকার যদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তাই সরকারের জন্য এখন জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ- এই দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ যোগ করেন বিসিআই সভাপতি।

‘রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হবে’

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ইউরোপমুখী রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সুয়েজ খাল ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। আর বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়েই সুয়েজ খালে প্রবেশ করতে হয়। ফলে এই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইয়েমেনের পক্ষ থেকে পুরো নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়নি। তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞার কথা বলছে।’

‘এ ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজের ইন্স্যুরেন্স কস্টও বেড়ে যায়। পাশাপাশি লজিস্টিক ব্যয় ও জাহাজ ভাড়াও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জাহাজ ভাড়া ও পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময়- এই দুটোই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

যদি এটা আসলেই বন্ধ হয়ে যায়, জ্বালানি আমদানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের রপ্তানি লিড টাইম বেড়ে যাবে। অনেক ঘুরে ইউরোপে যেতে হবে। সে পথে ইউরোপে যাওয়া মানে ব্যবসা করার খরচ বেড়ে যাওয়া। যদিও জাহাজ ভাড়া আমরা দিই না। তারপরেও এটা বায়ারের ওপর বর্তাবে। সেক্ষেত্রে জিনিসের দাম বাড়বে।-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান

ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘এখনো ক্রেতাদের কাছ থেকে বড় ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তারা আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেক ক্রেতা এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে পণ্য আনার ব্যবস্থা করছিলেন। আবার কেউ কেউ বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ রুট ব্যবহার করছিলেন, মূলত সময়ের বিষয়টি বিবেচনা করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতির প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনই বলা কঠিন। বুধবার থেকে পরিস্থিতির নতুন করে অবনতি হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তখন বোঝা যাবে, রপ্তানি বাণিজ্য, জাহাজ ভাড়া ও পণ্য পরিবহনের সময়ের ওপর এর কতটা প্রভাব পড়ছে।’

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যদি এটা আসলেই বন্ধ হয়ে যায়, জ্বালানি আমদানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের রপ্তানি লিড টাইম বেড়ে যাবে। অনেক ঘুরে ইউরোপে যেতে হবে। সে পথে ইউরোপে যাওয়া মানে ব্যবসা করার খরচ বেড়ে যাওয়া। যদিও জাহাজ ভাড়া আমরা দিই না। তারপরেও এটা বায়ারের ওপর বর্তাবে। সেক্ষেত্রে জিনিসের দাম বাড়বে। জিনিসের দাম বাড়লে সেটার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে ওখানকার কনজ্যুমারদের। ক্রয়ক্ষমতা যদি কমে যায়, তাহলে আমাদের অর্ডার কমে যাবে।’

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোয় জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। ইরান যুদ্ধের কারণে এ পথে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই ব্যাহত হচ্ছে। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আনার গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এবার সেই পথেও ঝুঁকি বেড়েছে।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর ও বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত পেরিম বা মাইয়ুন দ্বীপ দখল করেছে। দ্বীপটি প্রণালিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে ও এর অবস্থান সবচেয়ে সরু অংশের কাছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথে হুতিদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়েছে।

ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ

Original Source
https://www.jagonews24.com/economy/news/1156983
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Economy