বড়দেশীতে অপরাধের শেকড় কোথায়

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
রাজধানীর অদূরে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রাম। একদিকে ঘনবসতি, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চল। সন্ধ্যা নামলেই অনেকটা বদলে যায় এলাকার চিত্র। ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা, মাদক কেনাবেচা, কিশোরদের সংঘবদ্ধ চলাফেরা আর বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচন...

রাজধানীর অদূরে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রাম। একদিকে ঘনবসতি, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চল। সন্ধ্যা নামলেই অনেকটা বদলে যায় এলাকার চিত্র। ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা, মাদক কেনাবেচা, কিশোরদের সংঘবদ্ধ চলাফেরা আর বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় বড়দেশী।

সর্বশেষ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সেই আলোচনাই আবার সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় গ্রেফতার কয়েকজন কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। র‍্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে জড়িত।

মাদকের ‘ওপেন সিক্রেট’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বড়দেশী এলাকায় মাদক কেনাবেচা অনেকটাই প্রকাশ্য। বিশেষ করে নির্জন জায়গা, বালুর মাঠ ও বসতিপ্রবণ এলাকার বাইরে কিছু স্পটে মাদকসেবীদের আড্ডা চলে। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। সরকার দলীয় কয়েকজন নেতার পশ্রয়ে চলে এসব মাদক স্পট।

শুধু অভিযোগ নয়, বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বড়দেশী এলাকা থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালের জুনে বড়দেশী এলাকা থেকে গাঁজা ও হেরোইনসহ দুজনকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছিল পুলিশ।

এর আগে বড়দেশী পশ্চিমপাড়া এলাকা থেকে ২০ কেজি গাঁজাসহ একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও বড়দেশী পশ্চিমপাড়া থেকে বিপুল পরিমাণ হেরোইনসহ এক নারীকে গ্রেফতার করে। তবে এসব ‘নামমাত্র অভিযান’ বলছে কেউ কেউ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে বেশিরভাগ মানুষই মাদকের সংঙ্গে জড়িত। কেউ খায়, না হয় কেউ বিক্রি করে। পুলিশ প্রশাসন আগে থেকেই মাসোয়ারা নিয়ে নীরব থাকে।’

হত্যার পুরোনো ইতিহাস

বড়দেশীর অপরাধচিত্র শুধু মাদককেন্দ্রিক নয়। এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক হত্যাকাণ্ডের পুরোনো ইতিহাসও।

জানা গেছে, ২০০৭ সালের ৩ মার্চ আমিনবাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‍্যাব-১১ এর উপসহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির ও কনস্টেবল ফুল মিয়া নিহত হন। এর কিছুদিন পর একই এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে পুলিশের উপপরিদর্শক মতিউর রহমান নিহত হন।

এরপর আসে ২০১১ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনা। ১৭ জুলাই বড়দেশীর কেবলারচরে বেড়াতে যাওয়া ছয় ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং বড়দেশীর নাম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ওই মামলায় ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। অর্থাৎ এক দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারও শেষ পর্যন্ত বড় একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। কিন্তু এরপরও বড়দেশীর অপরাধের ইতিহাস থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে বাবা-ছেলে হত্যাকাণ্ড, ২০২৬ সালে দেলোয়ার হোসেন হত্যা, শারমিন আক্তার লিজা হত্যা এবং সর্বশেষ এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ড— সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও একের পর এক হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান

সর্বশেষ এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর বড়দেশীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে।

র‍্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেফতারদের মধ্যে আপন ও জিহাদ অপরাধপ্রবণ এবং তারা ওই অঞ্চলের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। র‍্যাব আপনকে একটি গ্যাংয়ের দলনেতা ও মাদক সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা অধিকাংশ মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। আটকরা সরাসরি হত্যার মিশনে অংশ নেন।

নির্জনতা কি অপরাধীদের সুযোগ দিচ্ছে?

বড়দেশীর ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে।

এলাকার কিছু অংশ তুলনামূলক নির্জন। ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চলের কারণে সন্ধ্যার পর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এমন পরিবেশ মাদকসেবী, মাদক কারবারি কিংবা অন্যান্য অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে এসেছে, দিনের বিভিন্ন সময়ও কিছু ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়।

তবে অপরাধের জন্য শুধু ভৌগোলিক অবস্থানকে দায়ী করা যায় না। পুলিশের টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, মাদকবিরোধী অভিযান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার—সবকিছুর সমন্বিত চিত্র প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষ কেন মুখ খুলতে ভয় পান?

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বললে হামলা বা হয়রানির আশঙ্কা থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তিনি ও তার ছেলে আগে মারধরের শিকার হয়েছিলেন।

এই ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু মাদক ব্যবসার প্রশ্ন নয়; বরং এলাকায় অপরাধীদের সামাজিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

আলতাব হত্যা কি সতর্কবার্তা?

এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ড বড়দেশীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গাড়ি পার্কিং ও অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে বিরোধের মধ্যে আলতাফ হোসেন সেখানে মধ্যস্থতা করতে যান। এরপর তিনি হামলার শিকার হন। তাকে ও তার ছেলেকে একটি পোশাক কারখানার ভেতরেও মারধর করা হয় বলে পুলিশ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। গুরুতর আহত আলতাব হাসপাতালে মারা যান।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- হামলার সময় তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও হামলা থামেনি বলে র‍্যাবের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় এরই মধ্যে একাধিক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছেন। র‍্যাবের দাবি, গ্রেফতারদের কয়েকজন কিশোর গ্যাং ও মাদক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান

বড়দেশীর অপরাধচিত্র বুঝতে হলে শুধু সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নয়, গত দুই দশকের পুলিশি নথি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোন বছরে কতটি হত্যা মামলা হয়েছে? কতজন নিহত হয়েছেন? কত মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়েছে? কতটির চার্জশিট হয়েছে? কত মামলার বিচার শেষ হয়েছে? কতজন সাজা পেয়েছেন? আর কতজন খালাস পেয়েছেন?

এর পাশাপাশি মাদক মামলার সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ বা দশ বছরে বড়দেশী এলাকায় কতটি মাদক মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা কী হয়েছে- সেই হিসাবও বের করা প্রয়োজন।

বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে- বড়দেশীর সমস্যা কি শুধুই কয়েকজন অপরাধীর কারণে? নাকি দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসা, নির্জন পরিবেশ, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, স্থানীয় বিরোধ এবং দুর্বল নজরদারির সমন্বিত ফল? এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। বড়দেশীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক হত্যাকাণ্ড, মাদক উদ্ধারের ঘটনা এবং কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধ হিসেবে দেখার পাশাপাশি এলাকাটির সামগ্রিক অপরাধপ্রবণতা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।

তবে বড়দেশীর সব বাসিন্দাকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। হাজারো সাধারণ মানুষ সেখানে বসবাস করেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। অপরাধ দমনে প্রয়োজন নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান, দৃশ্যমান পুলিশি টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর কারণ চিহ্নিত করা এবং মামলা দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।

যদিও সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, বড়দেশী গ্রামটিতে চলাচলের ব্যবস্থা নাজুক, তবুও গ্রামটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার পরিকল্পনা চলছে। আপরাধীদের চিহ্নিত ও ধরতে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা চলছে।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, শুধু পুলিশ নয়, মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংদের প্রতিহত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা বড়দেশীকে অপরাধমুক্ত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেব।


এফএ

Original Source
https://www.jagonews24.com/country/news/1156995
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Crime