বাবা মা যেভাবে সন্তানদের মধ্যে মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলবেন
একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা দুই ভাই-বোন। কখনো খেলনা নিয়ে তুমুল ঝগড়া, কখনো টিভির রিমোট নিয়ে মনোমালিন্য, আবার কিছুক্ষণ পরেই পাশাপাশি বসে গল্প কিংবা খেলায় মেতে ওঠা-শৈশবে ভাই-বোনের সম্পর্ক যেন এমনই। একদিকে খুনসুটি, অন্যদিকে গভীর টান। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মধুর সম্পর্ক যেন প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা কিংবা অভিমানে দূরে সরে না যায়, সেদিকে শুরু থেকেই নজর রাখা প্রয়োজন।
সন্তান মানুষ করা সহজ নয়। ঘরে একাধিক সন্তান থাকলে তাদের চাহিদা, স্বভাব ও মানসিকতার পার্থক্য সামলানো মা-বাবার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বড় সন্তান মনে করতে পারে, ছোটটি বেশি আদর পাচ্ছে।
আবার ছোটজনের মনে হতে পারে, বড় ভাই বা বোনই সবসময় বেশি সুবিধা পাচ্ছে। এসব ছোটখাটো অভিমান সময়ের সঙ্গে বড় দূরত্বে পরিণত হতে পারে। তাই ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে মা-বাবার কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি।
তুলনা নয়, প্রত্যেককে আলাদা করে দেখুন
‘তোমার ভাই তো এত ভালো পড়াশোনা করে’, ‘তোমার বোনের মতো হতে পারো না?’-এ ধরনের কথা অনেক সময় অভিভাবকরা সন্তানকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বলেন। কিন্তু এতে উৎসাহের বদলে তৈরি হতে পারে ঈর্ষা, হীনম্মন্যতা কিংবা ক্ষোভ।
প্রতিটি শিশুর ক্ষমতা ও আগ্রহ আলাদা। কেউ পড়াশোনায় ভালো, কেউ খেলাধুলায়, আবার কেউ হয়তো গান, ছবি আঁকা বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে দক্ষ। তাই একজনকে অন্যজনের মাপকাঠিতে বিচার না করে প্রত্যেক সন্তানের নিজস্ব গুণকে গুরুত্ব দিন।
প্রয়োজন অনুযায়ী সমান মনোযোগ দিন
দুই সন্তানকে সমান ভালোবাসা দেওয়া জরুরি। তবে দুজনের প্রয়োজন সবসময় এক হবে, এমন নয়। একজনের হয়তো পড়াশোনায় বাড়তি সহযোগিতা দরকার, অন্যজনের প্রয়োজন হতে পারে একটু বেশি সময় কিংবা মানসিক সমর্থন। তাই সবকিছু হুবহু সমান করার চেষ্টা না করে ন্যায্য হওয়ার চেষ্টা করুন। সন্তানদের বোঝান, পরিবারের কারও প্রয়োজনের সময় তাকে সহযোগিতা করা ভালোবাসারই অংশ।
ঝগড়ায় তৎক্ষণাৎ পক্ষ না নেওয়া
ভাই-বোনের ঝগড়া হলে একজনের কথা শুনেই অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। এতে যে শিশুকে দোষী করা হলো, তার মনে অন্যায় হওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। বরং দুজনের কথাই শুনুন। কে জিতল বা কে হারল, তার চেয়ে কীভাবে সমস্যাটি মেটানো যায়, সেটি শেখান। ছোটখাটো সমস্যা নিজেরা সমাধান করার সুযোগও দিন।
একসঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ তৈরি করুন
ভাই-বোনের বন্ধুত্ব বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো একসঙ্গে আনন্দের সময় তৈরি করা। বোর্ড গেম, গল্পের বই, রান্নায় সাহায্য, ঘরের ছোট কাজ কিংবা পারিবারিক ভ্রমণে দুজনকে একসঙ্গে যুক্ত করতে পারেন।
তবে সবসময় তাদের কী করতে হবে তা বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেদের মতো করে খেলতে ও গল্প করতে দিন। এই স্বাভাবিক সময়গুলোই ধীরে ধীরে সম্পর্ককে গভীর করে।
বড় হলেই সবসময় মানিয়ে না নেওয়ার চেষ্টা না করা
‘তুমি বড়, তাই তোমাকেই মানিয়ে নিতে হবে’-এই কথা বড় সন্তানকে বারবার বলা হলে তার মনে অভিমান তৈরি হতে পারে। বয়সে বড় হওয়ায় দায়িত্ববোধ শেখানো অবশ্যই ভালো, কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় বড় সন্তানকেই ছাড় দিতে বলা উচিত নয়।
দুই সন্তানকেই একে অন্যের অনুভূতি বোঝা, প্রয়োজন হলে ছাড় দেওয়া এবং নিজের ভুল স্বীকার করার শিক্ষা দিন।
ব্যক্তিগত জিনিসের প্রতি সম্মান শেখানো
ভাই-বোন কাছের মানুষ হলেও প্রত্যেকের নিজস্ব জগৎ থাকে। কারও বই, খেলনা, পোশাক বা ব্যক্তিগত জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার না করার অভ্যাস তৈরি করুন। এতে ছোটবেলা থেকেই একে অন্যের ব্যক্তিগত সীমারেখা ও পছন্দকে সম্মান করার শিক্ষা হবে।
একজনের সাফল্যে অন্যজনকে আনন্দ শেখানো
একজন পরীক্ষায় ভালো ফল করলে বা কোনো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেলে অন্য সন্তানকে ছোট করবেন না। বরং তাকে ভাই-বোনের সাফল্যে অভিনন্দন জানাতে উৎসাহ দিন। একই সঙ্গে সফল সন্তানকেও অহংকার না করে অন্যজনকে উৎসাহ দেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে একজনের সাফল্য অন্যজনের কাছে হুমকি নয়, আনন্দের বিষয় হয়ে ওঠে।
ভুল থেকে শেখানো
এক সন্তানের ভুলের কথা অন্যজনের সামনে বলে অপমান করবেন না। প্রয়োজন হলে শাসন করুন, কিন্তু তাকে ‘দুষ্ট’ বা ‘খারাপ’ বলে পরিচয় দেবেন না। আচরণটি ভুল এই কথা বোঝানো, শিশুটিকে ভুলের সঙ্গে এক করে ফেলবেন না।
এছাড়া ঝগড়ার পর জোর করে ‘সরি বলো’ বলার বদলে কেন তার আচরণে ভাই বা বোন কষ্ট পেয়েছে, সেটি বুঝতে সাহায্য করুন। ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার অভ্যাস দুটিই শেখানো জরুরি।
মা-বাবাই হোন সবচেয়ে বড় উদাহরণ
শিশুরা শুধু মা-বাবার কথা শুনে শেখে না, তাদের আচরণও অনুসরণ করে। বাবা-মা যদি একে অন্যের কথা মন দিয়ে শোনেন, মতের অমিলেও সম্মান বজায় রাখেন এবং ভুল হলে ক্ষমা চান, সন্তানরাও ধীরে ধীরে সেই আচরণ শিখবে।
ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া হবেই। অভিমানও থাকবে, মতের অমিলও হবে। তাই সম্পর্ককে একেবারে ঝগড়ামুক্ত করার চেষ্টা না করে তাদের শেখাতে হবে কীভাবে মতের অমিলের মধ্যেও ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা যায়।

শিশুর লেখাপড়ার হাতেখড়িতে মায়ের করণীয়
মা-বাবার সচেতনতা, ধৈর্য আর সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে শৈশবের ভাই-বোনের এই বন্ধনকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পর্কগুলোর একটিতে পরিণত করতে।
সূত্র: ইউনিসেফ, রাইজিং চিল্ডেন নেটওয়ার্ক, ফার্স্ট ওয়েভ ফ্যামিলিস
এসএকেওয়াই



