তিমি-ডলফিনের করুণ মৃত্যু কি কোনো বড় বিপদের নীরব পূর্বাভাস?
সাব্বির হোসাইন
বিস্তীর্ণ সুনীল জলরাশি আর অপার জীববৈচিত্র্যের আধার বঙ্গোপসাগর আজ যেন তার চিরচেনা স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে। বিপন্ন হচ্ছে এই জলভাগের অন্যতম গভীর ও রহস্যময় অঞ্চল ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে দক্ষিণে অবস্থিত পৃথিবীর দ্বিতীয় গভীরতম এই খাতটি দীর্ঘকাল ধরে তিমি ও ডলফিনের জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে উপকূলজুড়ে ভেসে আসা জলজ প্রাণীদের নিঃপ্রাণ দেহ এক অজানা আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে।
সম্প্রতি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে একের পর এক ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে আসার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এবার বরগুনার পাথরঘাটা সৈকতজুড়ে থমকে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ কেজি ওজনের একটি মৃত তিমি। অগভীর জলে যাদের বিচরণ নেই, সেই তিমির দেহ পাথরঘাটার তীরে পৌঁছানো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।

তিমি কি আসলেই মাছ?
মৃত তিমিটি উদ্ধারের স্থান থেকে ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’-এর দূরত্ব মাত্র ৪৫ কিলোমিটারের মতো। সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর খাতেই প্রাণীটির মৃত্যু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে জোয়ারের তোড়ে ভেসে এসে সৈকতে আটকে পড়ে।
কিন্তু বিশাল এই প্রাণীর মৃত্যুর মূল রহস্য কী? সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদের মতে, তিমির অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে সচরাচর কয়েকটি প্রধান অনুঘটক কাজ করে খাদ্যসংকট, খাবারের ভুল ধারণায় প্লাস্টিক বর্জ্য গিলে ফেলা, সমুদ্রের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হওয়া, জলতলে শব্দদূষণ এবং বৃহদাকারের জাহাজের ধাক্কা। তবে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত অত্যন্ত সীমিত। ফলে জাহাজের ধাক্কার সম্ভাবনা বাদ দিলে বাকি কারণগুলো বঙ্গোপসাগরের তলদেশের ভয়াবহ চিত্রকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সমুদ্রের তলদেশে এমন কোনো পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে কি না তা নিয়ে জলঘোলা কম হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং খাদ্যের চেইন ভেঙে পড়ার মতো বৈশ্বিক সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নিঃসৃত অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের বিশুদ্ধতা নষ্ট করছে।
বঙ্গোপসাগরের এমন বিষাদময় পরিবর্তন শুধু পরিবেশের জন্য নয়, বাংলাদেশ নামক উপকূলীয় এই ভূখণ্ডের জনজীবনের জন্যও এক অশুভ বার্তা। বিশাল এই জলজ প্রাণীদের মৃত্যু আদতে সাগরের বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার আগাম সংকেত।
এখনই সময় ডলফিন ও তিমি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচন করার। শুধু ক্ষোভ প্রকাশ না করে, জরুরি ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগর ও এর অভয়ারণ্য রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সমুদ্রের এই আর্তনাদ এক দিন মহাবিপর্যয় হয়ে তটরেখায় আছড়ে পড়বে।
লেখক: শিক্ষার্থী,তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গী
কেএসকে



