পদকের জন্য লড়াই করতে ক্রীড়াবিদ তৈরি করছি: আমিনুল হক
খেলাধুলাকে শুধু অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক আসরে পদকের জন্য লড়াই করতে ক্রীড়াবিদ তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
তিনি বলেন, আমরা শুধু এশিয়ান গেমস কিংবা অলিম্পিকের মতো সর্বোচ্চ আসরে অংশগ্রহণ করতে চাই না। আমরা চাই, পদক জেতার জন্য অংশগ্রহণ করতে। পদকের জন্য লড়াই করতে পারি সেই চিন্তা নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ক্রীড়া উৎসব-২০২৬-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমিনুল হক বলেন, খেলাধুলার কোনো বয়স নেই। নিজেকে সুস্থ রাখা ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য হাঁটাচলা, দৌড়ানো কিংবা খেলাধুলার চর্চা করা প্রয়োজন। খেলাধুলার এই চর্চার প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও পড়ে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মুক্তিযুদ্ধের সময় খেলাধুলার মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, খেলাধুলার মাধ্যমে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব এই চিন্তা থেকেই বর্তমান সরকার ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘শূন্য থেকে’ কাজ শুরু করেছে এবং ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
৫০০ ক্রীড়াবিদ পাবেন ক্রীড়া ভাতা
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে জানিয়ে আমিনুল হক বলেন, বর্তমানে প্রায় ৩০০ ক্রীড়াবিদ এই ভাতা পাচ্ছেন। চলতি মাসের শেষ নাগাদ আরও প্রায় ২০০ জনকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু খেলোয়াড় নয়, যোগ্য রেফারি ও কোচদেরও যাচাই-বাছাই করে ক্রীড়া ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন যেভাবে দেওয়া হয়, একইভাবে ক্রীড়া ভাতাও দেওয়া হচ্ছে।
এক মাস ক্রীড়া ভাতা বন্ধ থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি নতুন কর্মসূচি হওয়ায় সাময়িক সমস্যা হয়েছিল। ভাতা চালু করার জন্য এরইমধ্যে অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তা আবার চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বকেয়া ভাতাসহ পরবর্তী সব ভাতা একসঙ্গে ক্রীড়াবিদদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ক্রীড়া ভাতা দিতে সরকার প্রতি বছর ৬০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে। এই অর্থ দিয়ে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে ভাতার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত হবে। বাবা-মায়েরাও সন্তানকে শুধু ডাক্তার বা প্রকৌশলী বানানোর চিন্তা না করে ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী হবেন।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে’ ১৫ লাখ নিবন্ধন
তৃণমূল পর্যায় থেকে ক্রীড়াবিদ তুলে আনতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির কথা তুলে ধরে আমিনুল হক বলেন, এর ধারণাটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে এসেছে।
তিনি বলেন, প্রথম আসরে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিলেন। উপজেলা থেকে জেলা, বিভাগ হয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। গত ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার বিতরণের মাধ্যমে প্রথম আসর শেষ করেন।
দ্বিতীয় আসরের অনলাইন নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এবার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে দল গঠন করে ১০টি ইভেন্টে প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ লাখ অনলাইন নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। লক্ষ্য ছিল ১৪ লাখ ক্রীড়াবিদ। সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে নিবন্ধনের সময় বাড়ানো হলে এই সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমিনুল হক বলেন, ছেলে-মেয়ে ও কিশোর-কিশোরীদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিবার, স্কুল ও সমাজে একটি বার্তা যাচ্ছে খেলাধুলাই দল-মত নির্বিশেষে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।
৫০৩ উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগ
তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার অবকাঠামো শক্তিশালী করতে উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এরইমধ্যে ২০১টি উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের কার্যক্রম অনুমোদন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় উপজেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে।
তার ভাষ্য, জেলা পর্যায়ের ক্রীড়া কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করলে তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ তুলে আনা সহজ হবে।
বিকেএসপিতে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও পড়াশোনা
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম আসরে জাতীয় পর্যায়ে ভালো করা ৩০৬ জন ক্রীড়াবিদকে নিয়ে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) দুই মাসের প্রশিক্ষণ শুরু হবে বলে জানান আমিনুল হক।
তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণ থেকে অসাধারণ প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের বাছাই করা হবে। তাদের বিনামূল্যে সরকারি খরচে বিকেএসপিতে ভর্তি করানো হবে। খেলাধুলার পাশাপাশি তাদের পড়াশোনার দায়িত্বও সরকার বহন করবে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ নামে পাঠ্যবই
স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলার চর্চা বাড়াতে ২০২৭ সালের শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ‘খেলাধুলা’ নামে একটি পাঠ্যপুস্তক সংযোজন করা হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বইটি লেখার কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বর্তমানে এটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পরে চতুর্থ শ্রেণিতে বইটি বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আমিনুল হক বলেন, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর ১০টি ইভেন্টকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার বিষয়ে ধারণা দেওয়া হবে। রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই, তিন কিংবা পাঁচ বছর পর এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া শুরু হবে।
বছরব্যাপী প্রশিক্ষণে গুরুত্ব
এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে তারা জাপানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছেন।
তিনি বলেন, এশিয়ান গেমসের পর ১৩ থেকে ১৪টি ইভেন্টকে লক্ষ্য করে বছরব্যাপী ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষণের মধ্যে রাখা হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই তাদের প্রস্তুত করা হবে।
একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আমিনুল হক বলেন, কোনো বিদেশি কোচকে এনে এক মাসের মধ্যে একটি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। একজন কোচ বা ক্রীড়াবিদকে সময় দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা শুরু করেছি জিরো থেকে। বছরব্যাপী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এখান থেকে জাতীয় পর্যায়ে খেলবে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশ নেবে। ফলাফল যা-ই হোক, আমরা থেমে থাকতে চাই না। আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
আগামী পাঁচ বা ১০ বছর পর অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস কিংবা কমনওয়েলথ গেমসে শুধু অংশগ্রহণ নয়, পদকের জন্য লড়াই করতে পারে এমন ক্রীড়াবিদ তৈরিই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
এমএএস/এসএনআর


