২৩০ টাকা বেতন থেকে কোটিপতি, পদ্মা অয়েলের সেই নাছিরের ৩ বছরের কারাদণ্ড
মাত্র ২৩০ টাকা বেসিক বেতনে পিয়ন পদে চাকরিতে যোগ দিয়ে অল্প সময়ে কোটিপতি বনে যাওয়া পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রায় প্রকাশ করা হয় বলে জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন আদালতে দুদকের পিপি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কবির হোসেন। এর আগে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) এ রায় দেন চট্টগ্রাম মহানগর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান।
দুদকের পিপি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, ‘দুদক আইনের ২৬(২) ধারায় এক লাখ টাকা জরিমানা, ২৭(১) ধারায় তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্জিত অবৈধ সম্পদের সমপরিমাণ ২ কোটি ৭২ লাখ ৬১ হাজার ৬৭৩ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অনাদায়ে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।’
দুই কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৭ টাকার অর্জিত সম্পদের তথ্য গোপন এবং দুই কোটি ৭২ লাখ ৬১ হাজার ৬৭৩ টাকার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে এ দণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে উল্লিখিত উভয় ধারার সাজা একসঙ্গে চলবে এবং আদালত মামলায় জব্দ করা সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করেছেন বলে জানান দুদক পিপি।
পিপি বলেন, ‘মামলার বিচার চলাকালে আসামি নাছির আদালতে হাজির থাকলেও রায় ঘোষণার দিন তিনি পলাতক ছিলেন।’
দণ্ডিত মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন পদ্মা অয়েল পিএলসির প্রধান ডিপোকে ক্লারিকেল সুপারভাইজর হিসেবে কর্মরত। মামলার সময়ে তিনি সিবিএ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন এবং একই সঙ্গে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন। নাছির উদ্দিন চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানাধীন চাতরী গ্রামের মৃত শেখ মোহাম্মদের ছেলে।
এর আগে, ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্জিত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
জানা যায়, প্রথমে অস্থায়ী ‘সিকিউরিটি গার্ড’ পদে পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে যোগদান করলেও পরে ১৯৮৬ সালের ২৩ আগস্ট ২৩০ টাকা বেসিক বেতনে ‘পিয়ন’ পদে চাকরি নিয়মিত হয় তার। ২০১৪ সালের ‘ট্যাংক লরি হেলপার’ থেকে ‘চেকার’, পরের ছয় মাসের মাথায় ‘সুপারভাইজর’ হিসেবে পদোন্নতি পান।
জানা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে জমা হওয়া একটি অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে দুদক। দুদক প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১। ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল সম্পদবিবরণী জমা দিতে নাছির উদ্দিনকে নোটিশ জারি করে দুদক। ওই বছরের ১২ মে দুদকে সম্পদবিবরণী জমা দেন তিনি।
সম্পদ বিবরণী যাচাইকালে আনোয়ারার চাতরী এলাকায় শশী কমিউনিটি সেন্টারটি ২৫ লাখ ৫৮ ৭৫০ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করার কথা উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু প্রকৌশলী দিয়ে যাচাই করে সেটি নির্মাণে ১ কোটি ৪২ লাখ ৮৭ হাজার ১৩৪ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে নিশ্চিত হয় দুদক। ওই কমিউনিটি সেন্টারটি নির্মাণে ১ কোটি ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৪ টাকার অর্থ ব্যয় গোপন করেন তিনি। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৪ টাকা স্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করেন আসামি নাছির।
অন্যদিকে, দুদকে জমা দেওয়া সম্পদবিবরণীতে ১ কোটি ২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৪ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৯ হাজার ২২০ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পায় দুদক। এতে ৬৭ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৬ টাকা অস্থাবর সম্পদ গোপন করেছেন বলে নিশ্চিত হন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। সবমিলিয়ে ২ কোটি ১১ লাখ ৭১ হাজার ১৩০ টাকার স্থাবর- অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করেন।
এছাড়া দুই কোটি ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ৮৬ টাকার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন বলে নিশ্চিত হয় দুদক। এরপর দুদক প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর এ মামলা দায়ের করা হয়।
পরে তদন্তে দুই কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৭ টাকার অর্জিত সম্পদের তথ্য গোপন এবং দুই কোটি ৭২ লাখ ৬১ হাজার ৬৭৩ টাকার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে আদালতে অভিযোগ পত্র দেয় দুদক।
এমডিআইএইচ/এমএএইচ/