অভিনেতা সাদেক বাচ্চুকে রেল স্টেশনে কেন পাথর ছুড়ে মেরেছিল দর্শক?
পর্দায় খল চরিত্রে এমনভাবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন যে, একসময় দর্শক বাস্তবের সাদেক বাচ্চু আর পর্দার খলনায়ককে আলাদা করতে পারেননি। এমনকি দুর্দান্ত অভিনয়ে চরিত্র বাস্তবের মতো ফুটিয়ে তোলার কারণে একপর্যায়ে দর্শকের কাছ থেকে বাদামের খোসা ও পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছিল তার সঙ্গে।
মঞ্চ থেকে বেতার, টেলিভিশন হয়ে চলচ্চিত্র; সব মাধ্যমেই নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সাদেক বাচ্চু। তবে চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্যই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পর্দায় তার নেতিবাচক চরিত্র দেখে দর্শক যেমন তাকে নিন্দা করেছেন, তেমনি অভিনয়ের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ভালোবাসাও দিয়েছেন।
আজ গুণী এই অভিনেতার ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবস। ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সাদেক বাচ্চু। তার চলে যাওয়ার পরও বাংলা চলচ্চিত্রে তার অভিনীত অসংখ্য চরিত্র দর্শকের মনে অমলিন হয়ে আছে।
সাদেক বাচ্চুর জন্ম ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায়। তার পৈতৃক নিবাস চাঁদপুরে। তার আসল নাম মাহবুব আহমেদ। মাত্র ১৫ বছর বয়সে চাকরিজীবন শুরু করেন তিনি। বাংলাদেশ ডাক বিভাগে চাকরি করলেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে নিয়মিত অভিনয় চালিয়ে যান। ২০১৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন।
অভিনয়ের শুরুটা ষাটের দশকেই। ১৯৭২ সালের দিকে ‘গণনাট্য পরিষদ’ থিয়েটারে যুক্ত হন তিনি। সেখানে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক রচনা ও নির্দেশনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অভিনয়ে অভিষেক হয় তার। প্রযোজক আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইমামের ‘প্রথম অঙ্গীকার’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে পথচলা শুরু করেন তিনি।
এরপর অসংখ্য নাটক ও বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করেন সাদেক বাচ্চু। তবে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয় ১৯৮৫ সালে ‘রামের সুমতি’ সিনেমার মাধ্যমে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নায়কের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। পরে ধীরে ধীরে খল চরিত্রে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন।
বিশেষ করে ‘চাঁদনী’ সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। এরপর থেকে নেতিবাচক চরিত্রে তার উপস্থিতি যেন হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে আলাদা এক আকর্ষণ। তার অভিনীত চরিত্রগুলো এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠত যে, পর্দার বাইরে সেই চরিত্রের রেশও দর্শকের মনে থেকে যেত।
অভিনেতা নিজেই একটি অভিজ্ঞতার গল্প জানিয়ে বলেছিলেন, একটি সিরিয়ালে রাজাকারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সাদেক বাচ্চু। দর্শকমহলে তুমুল আলোচিত নাটকের এক দৃশ্যে একজনকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেন সাদেক বাচ্চু। সেই পর্ব প্রচারের পরদিন বোনকে আনতে ট্রেনে জামালপুর গিয়েছিলেন তিনি। স্টেশনে তাকে দেখে দর্শকেরা বাদামের খোসা ছুড়ে মারেন, কেউবা আবার পাথর ছুড়তে থাকেন। সেই যাত্রায় কোনোমতে সেখান থেকে আসতে পেরেছিলেন তিনি।
চরিত্রকে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই ছিল সাদেক বাচ্চুর অভিনয়ের বড় সাফল্য।
সাদেক বাচ্চুর উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘জীবন নদীর তীরে’, ‘জোর করে ভালোবাসা হয় না’, ‘তোমার মাঝে আমি’, ‘ঢাকা টু বোম্বে’, ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘এক জবান’, ‘আমার স্বপ্ন আমার সংসার’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’, ‘বধূবরণ’, ‘ময়দান’, ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘প্রিয়জন’ ও ‘সুজন সখী’।
খল চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ খল অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন এই অভিনেতা।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অভিনয়কে ভালোবেসেছেন সাদেক বাচ্চু। পর্দায় তার খল চরিত্র দেখে দর্শক কখনো ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কখনো তাকে ঘৃণা করেছেন, আবার কখনো সেই অভিনয়েই মুগ্ধ হয়েছেন।
এলআইএ


