তিনতলা ভবন আছে, শ্রেণিকক্ষও আছে, কিন্তু শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
চারদিকে থই থই পানি, মাঝখানে গ্রাম—সেখানেই শিক্ষার বাতিঘর। সকালে বিদ্যালয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। তিনতলা পাকা ভবনের শ্রেণিকক্ষগুলোও খুলে দেওয়া হয়। সবকিছু দেখে মনে হতে পারে, আর দশটি বিদ্যালয়ের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলছে পাঠদান। কিন্তু ক্লাস শুরুর সময় এলেই বদলে যায় চিত্র। একসঙ্গে সব শ্রেণিত...

চারদিকে থই থই পানি, মাঝখানে গ্রাম—সেখানেই শিক্ষার বাতিঘর। সকালে বিদ্যালয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। তিনতলা পাকা ভবনের শ্রেণিকক্ষগুলোও খুলে দেওয়া হয়। সবকিছু দেখে মনে হতে পারে, আর দশটি বিদ্যালয়ের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলছে পাঠদান। কিন্তু ক্লাস শুরুর সময় এলেই বদলে যায় চিত্র।

একসঙ্গে সব শ্রেণিতে পাঠদান চালিয়ে নেওয়ার মতো শিক্ষক নেই। ফলে কখনো এক শ্রেণির পাঠ শেষ করে অন্য শ্রেণিতে যেতে হয়, আবার কখনো শিক্ষক আসার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এমনই। অবকাঠামোর দিক থেকে বিদ্যালয়টি বেশ ভালো। রয়েছে তিনতলা পাকা ভবন, শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু শিক্ষকসংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।

বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকের পাঁচটি পদ রয়েছে। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন প্রধান শিক্ষক। প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি তাকেও পাঠদান করতে হয়। ফলে সব সময় শ্রেণিকক্ষে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। অন্যদিকে একজন সহকারী শিক্ষককে দিয়ে কোনো রকমে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

ফলে এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানোর সময় অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। কখনো আবার দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বসিয়ে পাঠদান করাতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত পাঠদানের পরিবেশ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগও কমে যাচ্ছে।

তিনতলা ভবন আছে, শ্রেণিকক্ষও আছে, কিন্তু শিক্ষক আছেন মাত্র দুজনসরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণিকক্ষ থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, ছবি: জাগো নিউজ

এক শিক্ষক, একসঙ্গে দুই শ্রেণি

সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। শ্রেণিকক্ষে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে আছে। দুই শ্রেণি মিলিয়ে উপস্থিত ছিল মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে পড়াচ্ছেন সহকারী শিক্ষক সামিউল নিকসন।

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন ব্যস্ত ছিলেন প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথিপত্র, দাপ্তরিক কাজ এবং অন্যান্য দায়িত্ব তাকেই সামলাতে হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য কার্যত একজন শিক্ষকই থাকছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একসময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৮০ জন, এখন সেখানে শিক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৩ জনে।

কমছে শিক্ষার্থী

শিক্ষকসংকটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতেও। নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ হারাচ্ছে। অভিভাবকেরাও সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহী হচ্ছেন। এভাবে ধীরে ধীরে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত শিক্ষকসংকট দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমতে পারে। এতে একদিকে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হবে, অন্যদিকে গ্রামের শিশুদের শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে তাকে উপজেলা সদরে যেতে হয়। আবার ক্লাস শেষ করেও বিভিন্ন সময় দাপ্তরিক কাজ করতে হয়। একজন সহকারী শিক্ষক দিয়ে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান করানোও কষ্টকর বিষয়।

তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক দিয়ে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান করানো অতিরিক্ত চাপের। এর মধ্যে তিনি বদলির জন্য আবেদন করেছেন। শিক্ষক না থাকায় অভিভাবকেরা সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চান না।’

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রভাব

শিক্ষকসংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় তাদের পড়াশোনায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

সহকারী শিক্ষক সামিউল নিকসন জাগো নিউজকে বলেন, প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় তাকেই একা ছয়টি শ্রেণির পাঠদান সামলাতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান উন্নয়নে সমস্যা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের ওপরও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুন্নি আক্তার বলে, ‘আমাদের শিক্ষক মাত্র দুজন। তাদের মধ্যে একজন অফিসের দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে একজন শিক্ষককে দিয়ে সব ক্লাস করানো সম্ভব হয় না। আমরা ঠিকমতো পড়তে পারছি না, পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে পারছি না। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।’

পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী ইজাজুল হক বলে, শিক্ষক না থাকায় ঠিকমতো ক্লাস হয় না। অনেক সময় তারা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষে বসে থাকে। আবার কখনো দুই শ্রেণির ক্লাস একসঙ্গে হয়। শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী অন্য বিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষক দেওয়া হলে তাদের লেখাপড়া আরও ভালো হবে।

তিনতলা ভবন আছে, শ্রেণিকক্ষও আছে, কিন্তু শিক্ষক আছেন মাত্র দুজনসরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পড়ছে শিক্ষার্থীরা, ছবি: জাগো নিউজ

অভিভাবকদের উদ্বেগ

শিক্ষকসংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরাও। তাদের মতে, একটি বিদ্যালয়ে ভবন থাকলেই শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হয় না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষক না থাকলে শ্রেণিকক্ষ, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো থাকলেও তার সুফল পাওয়া যায় না।

অভিভাবক কামাল মিয়া বলেন, ‘একজন শিক্ষক কীভাবে এতগুলো ক্লাস নেবেন? শিক্ষকসংকটের কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। আমরা খুব চিন্তিত। এভাবে যদি শিক্ষার মান কমতে থাকে, তাহলে আমাদের গ্রামের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘দ্রুত শিক্ষকসংকট দূর করা না হলে অভিভাবকেরা সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে পাঠাতে বাধ্য হবেন। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।’

ভবন আছে, শিক্ষক নেই

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়টি ছিল এলাকার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে শিক্ষকসংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

তাদের প্রশ্ন, তিনতলা পাকা ভবন থাকলেও যদি পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকেন, তাহলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর সুফল শিক্ষার্থীরা কতটা পাবে? নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয় সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন তারা।

শিক্ষকসংকট শুধু একটি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন পাঠদানকে ব্যাহত করছে না, এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শেখার মান, উপস্থিতি ও বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রবণতার ওপরও। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো এলাকার শিক্ষাব্যবস্থায়।

 অক্টোবরে শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস

এ বিষয়ে ধর্মপাশা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংকট পূরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘আগামী অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যালয়টির শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ শেষ করা হবে।’

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত শিক্ষকসংকটের সমাধান হবে। কারণ, বিদ্যালয়ের ভবন যতই বড় হোক, পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়া সেখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। পাঁচটি শিক্ষকের পদের বিপরীতে মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে চলছে সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা আরও তীব্র হতে পারে।

এমএমএআর

Original Source
https://www.jagonews24.com/education/news/1157126
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Education