দখল-দূষণ আর ভরাটে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাকালুকি হাওর
এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি ও বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর নানা সংকটে হারাচ্ছে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। জুড়ী নদীসহ হাওরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ১০টি নদী ও অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া দিয়ে প্রতিনিয়ত ঢুকছে বর্জ্য ও বালু। এতে ভরাট হচ্ছে হাওরের বিল, কমছে জলাধারের গভীরতা; পাশাপাশি বিল শুকিয়ে যাওয়া, মাছ শিকার, কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার ও দখলের কারণে বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
হাওর এলাকার বাসিন্দারা জানান, হাকালুকি হাওর লাখ লাখ মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। হাওরে মাছ শিকার করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন, আবার অনেকে নির্ভর করেন কৃষির ওপর। তবে কয়েক বছর ধরে হাওরের পরিবেশ ক্রমেই দূষিত হচ্ছে। নির্বিচারে সেচ দিয়ে মাছ শিকার, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং হাওরের জায়গা দখলের কারণে এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
‘হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে একটা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওরের বর্জ্যে ব্যবস্থাপনাসহ বেশকিছু উন্নয়ন হবে আশাকরি।’
বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কারণে ধীরে ধীরে হাকালুকি হাওর তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। হাওর রক্ষায় সরকারি উদ্যোগে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকিতেও দেখা যায় না বলে অভিযোগ তাদের।

জানা গেছে, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। এরমধ্যে শুধুমাত্র বিলের আয়তন ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। মৌলভীবাজার জেলার় বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী, এবং সিলেট জেলার় ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। জুড়ী, ফানাই, সুনাইসহ ১০টি নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া হাওরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। জুড়ী, সুনাই ও পানাই নদী এই বিশাল হাওরের মূল প্রবাহ। সময়ের সঙ্গে পলি বালু জমে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে কলমে ২৩৮ টি বিল থাকলেও প্রায় অর্ধেক বীলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো অবশিষ্ট আছে এগুলোও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর কয়েক আগে যেসব বিলের নাব্যতা ৩৫-৩০ ফুট গভীর ছিল এগুলো এখন কমে ১৫-২০ ফুট চলে এসেছে। এখনও যেসব বিল আছে এগুলো খনন না করলে আগামী একদশকে ভরাট হয়ে যাবে। এছাড়া ১৮ হাজার হেক্টর হাওরের আয়তন লেখা থাকলেও বাস্তবে কতটুকু আছে তা কেউ জানে না। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা অনেকেই ঘরবাড়ি করে হাওর দখল করে নিয়েছেন এমন অভিযোগ রয়েছে।

কৃষকের সার গুদামে আছে, মাঠে নেই
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব ও হাওর কৃষি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা জাগো নিউজকে বলেন, কয়েকটি কারণে হাওর বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাকালুকি হাওর। হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণে পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানির শ্রুতে যে বালি আসে এগুলো জমা হয়ে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে হাওর পানি ধরে রাখতে পারছে না। আমরা যেসব প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছি এগুলো যত্রতত্র হাওরের পানির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি এসব বর্জ্যের কারণে হাওর ভরাট হচ্ছে।
‘হাওর সংরক্ষণের জন্য সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তর আছে। হাকালুকি হাওরের পরিবেশ রক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন এইসব পদক্ষেপ তাদেরকে নিতে হবে। না হলে হাওর ভরাট হয়ে যাবে। বিশেষ হাওরকে দূষণমুক্ত ও খনন করা এখুনি প্রয়োজন। একটা সময় হাওরে অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেতো এখন তা আর পাওয়া যায় না। হাওরকে দখল দূষণমুক্ত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, উজান থেকে যেসব পানি আসে এগুলো বঙ্গোপসাগরে নামার আগে বড়বড় সেতুর পিলারের কারণে বাঁধা গ্রস্ত হচ্ছে যার ফলে নদীগুলোতে বালু জমা হয়ে চর সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নদীতে আগের মতো পানি ধারণ ক্ষমতা রাখার জায়গা নেই। আমাদের যেসব হাওরে মাছ, ফসল উৎপাদন ও পানি থাকার কথা এসব জায়গায় সবকিছু কমে যাচ্ছে হাওর ভরাট হওয়ার কারণে। পলি মাটির জায়গায় বালু এসে হাওর ভরাট হচ্ছে। হাওর সুরক্ষার জন্য সরকারিভাবে যতটুকু উদ্যোগ নেওয়ার কথা সেইটুকু নেওয়া হচ্ছে না। এই সব কারণে হাওর তার গভীরতা হারাচ্ছে। হাওরে জলজ উদ্ভিদ কমে গেছে। হাওরে আগের মতো মাছ নেই, এর কারণ হলো মানুষ সৃষ্ট বর্জ্য ও পানি দূষণের কারণ।

হাওর ঘুরে দেখা যায়, জেলার অন্যতম জুড়ী নদী এই নদীর পুরাতন ব্রিজ থেকে নতুন ব্রিজ হয়ে জায়ফরনগর ইউনিয়নের নয়াগ্রামের দিকে যতদূর সামনে যাওয়া যায় ততদূর পর্যন্ত দেখা যায় সারি সারি প্লাস্টিক, জুতা, পানি ও কোমল পানীয় বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য এর স্তুপ জুড়ি নদীতে ভাসছে। এই বর্জ্যগুলো সরাসরি গিয়ে পড়ছে দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওরে। আর এসব বর্জ্য হাওরে ভেসে বেড়াচ্ছে।
জুড়ী উপজেলা বাজারের বর্জ্য ফেলার কোনো স্থান না থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন জুড়ী নদীতে ময়লা আবর্জনা ফেলছেন। এসব বর্জ্য কোনো বাঁধা ছাড়া সরাসরি গিয়ে হাকালুকি হাওরে পড়ছে। শুধু জুড়ী নদী নয় সরাসরি হাওরের সাথে যতটা নদী ও ছড়া আছে সব-কয়টা দিয়ে সরাসরি বর্জ্য গিয়ে হাওরে পড়ছে। ফলে হাওরের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এসব বর্জ্য একদিকে দূষিত হচ্ছে হাওরের পানি অন্যদিকে ভরাট হচ্ছে হাওর। হাওর ভরাটের প্রভাবে অল্প বৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা সৃষ্টি হওয়ায় সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাওর।
জুড়ী উপজেলার হাওর পাড়ের বাসিন্দা রায়হান আহমেদ বলেন, হাওরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। হাওরের পানির নিছে হাত দিলেই শুধু প্লাস্টিক হাতে আসে। হাওরের গভীরতা অনেকটাই কমে গেছে। আগে যে জায়গায় ১৫-২০ ফুট গভীর পর্যন্ত পানি ছিলো এখন সেই জায়গায় ৫-৭ ফুট পানি আছে। পলি মাটি ও বালু এসে ধীরে ধীরে বিলগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে হাওর রক্ষার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতির সালেহ সোহেল বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হাওর। এই হাওরটি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। হাকালুকি হওরের বিলগুলো জরুরিভাবে খনন করা প্রয়োজন। দখলকৃত জায়গা মুক্ত করতে হবে। হাওরের জলজ উদ্ভিদগুলো রক্ষা করতে হবে। হাওরের প্রবেশ পথে ছড়া ও নদীগুলো খনন করতে হবে। এখন হাওরে কী পরিমাণ বিল আছে তা সঠিক হিসেব করা প্রয়োজন।
‘কয়েকটি কারণে হাওর বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাকালুকি হাওর। হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণে পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানির শ্রুতে যে বালি আসে এগুলো জমা হয়ে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে হাওর পানি ধরে রাখতে পারছে না। আমরা যেসব প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছি এগুলো যত্রতত্র হাওরের পানির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি এসব বর্জ্যের কারণে হাওর ভরাট হচ্ছে।’
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, হাকালুকি হাওরের বর্জ্য যাচ্ছে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেখা হয়। অথবা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা এটা দেখাশোনা করে এটা তাদের দায়িত্ব। এছাড়া আমাদেরকে বললে আমরা সেখানে যাবো। আমাদের জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া যায় না।
পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, হাওর সংরক্ষণের জন্য সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তর আছে। হাকালুকি হাওরের পরিবেশ রক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন এইসব পদক্ষেপ তাদেরকে নিতে হবে। না হলে হাওর ভরাট হয়ে যাবে। বিশেষ হাওরকে দূষণমুক্ত ও খনন করা এখুনি প্রয়োজন। একটা সময় হাওরে অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেতো এখন তা আর পাওয়া যায় না। হাওরকে দখল দূষণমুক্ত করতে হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, কাগজে কলমে হাকালুকি হাওরে ২৩৮টি বিল আছে। তবে বাস্তবে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। হাওরে ৬০ শতাংশ বিল ইজারা দেওয়া হলেও বাকি বিলগুলো ভরাট হওয়ার কারণে ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। সব জায়গায় ২৩৮টা বিল উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। অর্ধেক বিল ভরাট হওয়ার কারণে হাওরে পানি থাকে না। গত বছর হাওরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া গেছে এই বছর তাও মিলবে না। হাকালুকি হাওর বিভিন্ন কারণে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। হাওরের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে হলে বিলগুলো খনন করতে হবে। একটা সময় হাওরে দেশীয় ২৬০ প্রজাতির মাছ ছিল। ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৪৩ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেছে। আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে জানা যাবে এখন কত প্রজাতির মাছ হাওরে আছে।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, হাওরের সমস্যা নিয়ে আমার কিছু জানা নেই। হাওর উন্নয়ন প্রকল্প হবে কিনা এটা আমার বিষয় না, যারা হাওর নিয়ে কাজ করেন তারা দেখবেন।
বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সি.এম ইউসুফ হোসাইন বলেন, হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে একটা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওরের বর্জ্যে ব্যবস্থাপনাসহ বেশকিছু উন্নয়ন হবে আশাকরি।
এনএইচআর



