সৌদির বিমানঘাঁটিতে হুথিদের হামলা, ইরানের সঙ্গে জিসিসির বৈঠক বাতিল
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বহুমুখী সংঘাত এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক বিশ্বসংকটে রূপ নিয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে’ রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে দক্ষিণ অঞ্চলের খামিস মুশাইতের ওই ঘাঁটিটির হ্যাঙ্গার, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে এই বড় মাপের হামলা চালানো হয়েছে বলে তাদের দাবি।
হামলার ঘটনার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইতসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় চারটি বেসামরিক এলাকায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জরুরি রেড অ্যালার্ট জারি করে এবং বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়।
এর আগে গত সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ব্যাপক সামরিক সাফল্য অর্জন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
একই সময়ে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ 'ইস্ট-ওয়েস্ট তৈল পাইপলাইন' একটি শক্তিশালী ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্ধ হয়ে যায়।
রিয়াদ এই হামলার দায় ইরাক-ভিত্তিক ইরান সমর্থিত যোদ্ধাদের ওপর চাপালেও এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। কারণ হরমুজ প্রণালির নৌ-অবরোধ এড়িয়ে তেল রপ্তানি করার জন্য এটিই ছিল সৌদি আরবের প্রধান বিকল্প পথ।
পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্ব বাজারে দৈনিক তেল সরবরাহ প্রায় চার শতাংশ হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে তিন শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য রেকর্ড গড়ে প্রতি গ্যালনে ৬.২৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধোঁয়ার কুণ্ডলী স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
উত্তপ্ত এই যুদ্ধপরিস্থিতির মধ্যে সোমবার ওমানে জিসিসি (জিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের একটি পূর্বনির্ধারিত আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ মুহূর্তে স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ইরানে আক্রমণ চালানোর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সেই সংকটের মধ্যে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সাইয়্যেদ বদর আলবুসাইদি সর্বসম্মতিক্রমে বৈঠকটি স্থগিত করার কথা জানান, যদিও ইরান দাবি করেছে যে সৌদির অনুরোধেই বৈঠকটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ওদিকে ইরান বিশ্ব নৌপথের ওপর চাপ বাড়াতে তাদের ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকাভুক্ত ৭৭টি আন্তর্জাতিক জাহাজের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। দেশটির সরকারের দাবি, এই জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের প্রোটোকল লঙ্ঘন করেছে। ফলে এই তালিকায় থাকা যেকোনো নৌযানকে ভবিষ্যতে বাজেয়াপ্ত, জবরদখল কিংবা জরিমানা করা হবে বলে ইরান হুশিয়ারি দিয়েছে।
ইয়েমেনে যুদ্ধের এই নাটকীয় মোড় এবং সহিংসতা বৃদ্ধি মার্কিন প্রশাসনের ওপর এক বড় ধরণের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুদ্ধ থামানোর চরম চাপে রয়েছেন, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন তার ঘনিষ্ঠ রিয়াদ মিত্রদের সামরিক সাহায্য প্রদান এবং নতুন আরেকটা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে ব্যাপক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার জন্য ওয়াশিংটনের কাছে জোর দাবি জানালেও ট্রাম্প প্রশাসন সেই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। ট্রাম্প আইরিশ সফরে এক বক্তব্যে আশা প্রকাশ করে জানান, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর খুব দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শেষ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম শিলার মতো হু হু করে নিচে নেমে আসবে।
এসএএইচ

