১৪৭ বছরের টেস্ট ইতিহাসে যা কেউ পারেননি, সেই কীর্তি গড়লেন রুট
ইংল্যান্ড টেস্ট দলের অধিনায়ক জো রুটের টেস্ট ক্যারিয়ারে রেকর্ড ভাঙা যেন নিয়মিত ঘটনাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এজবাস্টনে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টে ৬২ রানে অপরাজিত থেকে একসঙ্গে একাধিক কীর্তি গড়েছেন এই ইংলিশ ব্যাটার।
১৪৭ বছরের টেস্ট ইতিহাসে প্রথম ব্যাটার হিসেবে চতুর্থ ইনিংসে ২ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। একই ইনিংসে এজবাস্টনে ১ হাজার টেস্ট রানও পূর্ণ করেছেন রুট। পাশাপাশি টেস্টে সবচেয়ে বেশি ফিফটির রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
চতুর্থ ইনিংসে ২ হাজার রানের প্রথম ব্যাটার
টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংকে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ম্যাচের শেষ দিকে উইকেট সাধারণত ব্যাটিংয়ের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে, স্কোরবোর্ডে থাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং প্রতিটি উইকেটই তাড়া করা দলের জয়ের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। এই কঠিন পরিস্থিতিতেই জো রুট নিজেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
পাকিস্তানের দেওয়া ১৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ২ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে ইংল্যান্ড। ইনিংসের প্রথম ওভারেই বেন ডাকেট ও এমিলিও গে ফিরে যান। ফলে পাকিস্তান তখন ছোট লক্ষ্য নিয়েও ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
এরপর ক্রিজে আসেন রুট। চাপের মুহূর্তে ব্যাট হাতে দলের ভরসা হয়ে ওঠা তার ক্যারিয়ারের পরিচিত গল্প। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
জর্ডান কক্সকে সঙ্গে নিয়ে রুট ইংল্যান্ডের ইনিংস সামলান। শেষ পর্যন্ত ৬২ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। কক্স অপরাজিত ছিলেন ৫৯ রানে। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ১৩০ রান তুলে ৮ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড।
এই ইনিংসেই রুট চতুর্থ ইনিংসে নিজের ২ হাজার রান পূর্ণ করেন। টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৭ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যাটার, যিনি ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ২ হাজার বা তার বেশি রান করেছেন। চতুর্থ ইনিংসে রুটের এই সাফল্য তার দীর্ঘ টেস্ট ক্যারিয়ারে চাপের মধ্যে ব্যাটিং করার অসাধারণ সামর্থ্যেরই প্রমাণ।
এজবাস্টনেও প্রথম রুট
একই ইনিংসে আরও একটি রেকর্ড গড়েছেন রুট। এজবাস্টনে ১ হাজার টেস্ট রান করা প্রথম ব্যাটার হয়েছেন তিনি।
ম্যাচ শুরুর আগে বার্মিংহামের এই ঐতিহাসিক মাঠে রুটের রান ছিল ৯৪৮। ১ হাজার পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫২ রান। পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৬২ রানের ইনিংসে সেই প্রয়োজনও মিটিয়ে ফেলেন তিনি। এজবাস্টন এখন এমন চতুর্থ টেস্ট ভেন্যু, যেখানে রুটের রান ১ হাজার ছাড়িয়েছে।
টেস্টে নির্দিষ্ট ভেন্যুতে রুটের রান-
লর্ডস: ২,২০৩
ম্যানচেস্টার: ১,১২৮
দ্য ওভাল: ১,০৫০
এজবাস্টন: ১,০১৮
চারটি ভেন্যুতে ১ হাজারের বেশি টেস্ট রান করা ব্যাটারদের তালিকায় রুট এখন জ্যাক ক্যালিস ও রিকি পন্টিংয়ের সঙ্গে আছেন। অর্থাৎ এই কীর্তি গড়া মাত্র তৃতীয় ব্যাটার তিনি।
শচিনকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে বেশি ফিফটি
এজবাস্টনে ৬২ রানের অপরাজিত ইনিংসটি রুটের জন্য আরও একটি কারণে বিশেষ। এটি ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে তার ৬৯তম ফিফটি। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। শচিন টেস্ট ক্যারিয়ারে করেছিলেন ৬৮টি ফিফটি। রুটের এখন ৬৯টি।
টেস্টে সবচেয়ে বেশি ফিফটির তালিকায়-
১. জো রুট: ৬৯
২. শচিন টেন্ডুলকার: ৬৮
৩. শিবনারায়ণ চন্দরপল: ৬৬
৪. অ্যালান বোর্ডার: ৬৩
৫. রাহুল দ্রাবিড়: ৬৩
৬. রিকি পন্টিং: ৬২
শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, রুটের এই রেকর্ডের আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। টেন্ডুলকারের ৬৮টি ফিফটি পূর্ণ করতে যত টেস্ট ইনিংস লেগেছিল, রুট তার চেয়েও কম ইনিংসে ৬৯টি ফিফটি করেছেন।
১১০টি ফিফটি-প্লাস ইনিংস
৬২ রানের ইনিংসটি রুটের টেস্ট ক্যারিয়ারের ১১০তম ফিফটি-প্লাস স্কোরও। এর মধ্যে রয়েছে ৪১টি সেঞ্চুরি ও ৬৯টি ফিফটি। অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেটে রুট ১১০ বার অন্তত ৫০ রান করেছেন। তার ৬৯টি ফিফটির পাশাপাশি সেঞ্চুরি ৪১টি- যা তার ধারাবাহিকতারই বড় প্রমাণ।
এজবাস্টনে তার এই ৬২ রানের ইনিংসের পরই সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৪১ সেঞ্চুরি ও ৬৯ ফিফটিতে। অর্থাৎ টেস্ট ক্যারিয়ারে অর্ধশতক পেরিয়ে যাওয়া ইনিংসের প্রায় প্রতিটিতেই বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য দেখিয়েছেন তিনি।
রুটের ব্যক্তিগত রেকর্ডের রাতটি আরও স্মরণীয় হয়েছে ইংল্যান্ডের দলীয় সাফল্যে। পাকিস্তানকে তৃতীয় টেস্টে ৮ উইকেটে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছে ইংল্যান্ড।
এজবাস্টনে পাকিস্তান ইংল্যান্ডের সামনে জয়ের জন্য ১৩০ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল। কিন্তু শুরুতেই ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়লেও রুট ও কক্সের ব্যাটে সেই চাপ দ্রুত কেটে যায়। রুট ৬২ ও কক্স ৫৯ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জয় এনে দেন।
ফলে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজজুড়ে দাপুটে পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রুটও নিজের রেকর্ডের খাতায় যোগ করেছেন একাধিক মাইলফলক। চতুর্থ ইনিংসে ২ হাজার রানের প্রথম ব্যাটার, এজবাস্টনে ১ হাজার রানের প্রথম ব্যাটার এবং টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ফিফটির মালিক- এক ইনিংসেই এমন তিনটি বড় অর্জনই এখন তার নামের পাশে।
আইএইচএস/


